(নিউ ইয়র্ক) – হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আজ বিবৃতিতে বলেছে, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা দিতে কারখানার মালিকদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়া বন্ধ করতে এবং শ্রমিকনেতাদের উপর হামলাকারীদের আইনি ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ নেয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় বড় বড় খুচরা বিক্রেতাসহ বিদেশী ক্রেতাদের নিশ্চিত করা উচিত যে তাদের বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা শ্রমিক অধিকার মেনে চলে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ঢাকায় ও তার আশেপাশের ২১টি কারখানার ৪৭ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছে। শ্রমিকদের দাবি, ইউনিয়ন গড়ার সঙ্গে জড়িতদের কোন কোন ম্যানেজার ভয়ভীতি দেখায় ও হুমকি দেয়; এমনকি মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। কয়েকজন ইউনিয়ন সংগঠক জানান, তাদেরকে পেটানো হয়েছে। অন্যারা জানান তাদের চাকরিচ্যুত করা হয় অথবা চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তারা আরো জানান, মাঝে মাঝে কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের হুমকি দিতে এবং কারখানার বাইরে এমনকি তাদের বাসাতেও হামলা চালাতে স্থানীয় মাস্তানদের কাজে লাগায়।

রানাপ্লাজার ধসে (৩) ১,১০০ তৈরিপোশাক শ্রমিক নিহতের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ তার শ্রম আইন সংশোধন করে। এরআগে শ্রম মন্ত্রণালয় অল্প কয়েকটি ছাড়া বাকী ইউনিয়নগুলো নিবন্ধন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আইন সংশোধনের পর ইউনিয়ন গঠন প্রক্রিয়া আরো সহজ হয়। কারখানা পর্যায়ে ৫০টির বেশি ইউনিয়ন গঠন হয়েছে, তবে আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন নিবন্ধন করতে কারখানার ৩০ ভাগ শ্রমিকের সমর্থন দরকার পড়ে। তাই মালিকদের হুমকি ও ভয়ভীতির কারণে কারখানায় ইউনিয়ন গঠন কঠিন হয়ে পড়ে; বিশেষ করে যেসব কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে।

এশিয়ার পরিচালক ব্র্যাড এডামস (৪) বলেছেন, “রানা প্লাজার মতো বিপর্যয় ও শ্রমিক-শোষণ অবসানে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে উৎসাহ দেয়া দরকার।

“দেরিতে হলেও সরকারের ইউনিয়নগুলোর নিবন্ধন শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কিন্তু কারখানার মালিকরা যেন ইউনিয়ন নেতাদের নির্যাতন না করে এবং তাদেরকে কাজ করতে দেয় সেদিকে এখন খেয়াল রাখতে হবে।”

বাংলাদেশে ৫ হাজারের বেশি তৈরিপোশাক কারখানা আছে। জরুরিভিত্তিতে শ্রম অধিকার ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার ধরে রাখার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় ইউনিয়ন উভয়েই জড়িত।

শ্রম আইন মেনে চলা হচ্ছে কিনা তা সরকার ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাচারারস এন্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর নিশ্চিত করা দরকার এবং শ্রম অধিকার বিরোধী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বাংলাদেশ সংগঠন করার স্বাধীনতা ও যৌথ দরকষাকষি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৮৭ (৫) ও ৯৮ (৬) নম্বর কনভেনশন অনুমোদন করেছে তাই এর অন্তর্নিহিত অধিকারগুলো তার রক্ষা করা দরকার।

বাংলাদেশ শ্রম আইন (২০০৬, ২০১৩ সালে সংশোধিত) এর ১৯৫ ধারায় অন্যায্য শ্রম অনুশীলন বেআইনি করা হয়েছে। যেমন, কোন নিয়োগকর্তা, “কোন শ্রমিক কোন ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য অথবা কর্মকর্তা হলে বা হতে চাওয়ায়, অথবা অন্য কোন কাউকে উক্তরূপ সদস্য বা কর্মকর্তা হতে প্ররোচিত করায়, অথবা কোন ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে, কার্যকলাপে ও এর প্রসারে অংশ নেয়ার কারণে তাকে চাকরি থেকে বরখান্ত, ডিসচার্জ অথবা অপসারণ করতে পারবেন না অথবা এজন্য তাকে ভয় দেখাতে অথবা তার চাকরির কোন ধরণের ক্ষতি করার হুমকিও দিতে পারবেন না।” 

ইউনিয়ন করায় শ্রমিকদের হুমকি ও হামলার ঘটনার সাক্ষীদের বক্তব্য

২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ঢাকায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অনেক সাক্ষী এ ধরণের অবমাননাকর অনুশীলনের কথা জানিয়েছেন।

একজন নারী শ্রমিক জানায় তার কারখানার শ্রমিকরা যখন কোম্পানির মালিকের কাছে ইউনিয়ন নিবন্ধনের ফরম দেয়, মালিক তা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে হুমকি দেন যে, তিনি কখনোই ইউনিয়ন করতে দেবেন না। পরবর্তীতে তার দুই সহকর্মীকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা কাঁচি নিয়ে হামলা করে। এর দুই সপ্তাহ পর, এলাকার এক মাস্তান ও মালিকের ভাইসহ কয়েকজন তার বাসায় গিয়ে হুমকি দিলেতিনি চাকরি ছাড়তে রাজি হয়।

বহু নারী শ্রমিক জানিয়েছে, তারা যৌন হয়রানি-হুমকি ও গালিমন্দের সম্মুখীন হয়েছে। যেমন, শ্রমিকরা জানায়, এক কারখানার সুপারভাইসর সবাইকে হুমকি দেয় যে, যেই নারী শ্রমিক ইউনিয়নে যোগ দেবে তার কাপড় খুলে রাস্তায় ফেলে দেয়া হবে।

অন্যখানে এক ম্যানেজার বলেন, এক ইউনিয়ন নেত্রী তার কারখানাকে ‘দূষিত’ করছিল এবং তার পতিতাপল্লিতে কাজ করা উচিত।

আরেক কারখানার এক ইউনিয়ন নেতা জানান, ফোনে তাকে হুমকি দেয়া হয়েছে- সে যেন আর কাজে না আসে এবং কাজে গেলে তাকে হত্যা করা হবে। পরদিনতিনি কাজে গেলে কয়েকজন লোক তাকে ঘিরে পেটায় এবং ব্লেড দিয়ে শরীর চিরে দেয়।

একটি বড় কারখানার শ্রমিকরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানায় যে তারা ম্যানেজারদের না জানিয়েই ইউনিয়ন গঠনের চেষ্টা করছে, কারণ ম্যানেজাররা জানতে পারলে তারা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে এবং  তাদের চাকরি হারাতে হতে পারে। অন্যান্য ইউনিয়ন সংগঠকরা হুমকি ও মারধরের শিকার না হলেও অপদস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। কেউ কেউ জানায়, তারা যাতে সহকর্মীদের সাথে কথা বলার সময় না পায়, তাই তাদেরকে বাড়তি কাজ দেয়া হতো। আবার কেউ জানায়, কারখানার ম্যানেজাররা তাদের সাথে দেখা করতে চাইতো না।

শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ কিছু কারখানায় ইউনিয়ন প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন নয়। আদতে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে এবং তাদের পছন্দ মত ইউনিয়নে যোগ দিতে বাধা দিতে কারখানার মালিকরা নিজেরাই ওসব “ভুয়া ইউনিয়ন” গঠন করেছে।

বহু শ্রমিক জানায়, বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় শ্রম-সম্পর্ক ও কর্ম-পরিবেশ কতটা খারাপ। সেজন্য প্রায়ই ধর্মঘট, বিক্ষোভ হতে থাকে, যা কখনো কখনো সহিংস রূপ নেয়।

স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অনুমতি দিলেও পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলে কারখানার মালিকরা বিশ্বাস করে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন তারা। ইউনিয়ণের নিয়ন্ত্রণ নিতে তার কারখানার অভিযুক্ত এক শ্রমিকনেতা নিজেরদের মধ্যে মারামারি করেছে। আরেক মালিকের উদ্বেগ- রাজনৈতিক দলগুলো ইউনিয়নগুলো প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চালাতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যে শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল তাদের বেশিভাগই তৈরিপোশাক রপ্তানিকারক কারখানায় কাজ করত, যাদের আন্তর্জাতিক বিক্রেতার ‘কোড অব কনডাক্ট মান্য করার কথা। এই বিধির মধ্যে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার দানও রয়েছে।

২০১২ সালের নভেম্বরে তাজরিন ফ্যাশন্স কারখানায় আগুণে ১১৮ জন শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর রানা প্লাজা বিপর্যয়ের ঘটে। এই দুটি ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ সরকার ও তৈরিপোশাক শিল্প মালিকদের শ্রম অধিকারের উন্নতি করতে আহ্বান জানায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় ইউনিয়নই হচ্ছে বাংলাদেশি  তৈরিপোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার।

২০১৩ এর জুনে যুক্তরাষ্ট্র জেনারালাইসড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্স (জিএসপি)- এর অধীনে বাংলাদেশকে দেয়া বাণিজ্যিক সুবিধা স্থগিত করে। যুক্তরাষ্ট্র জানায়, এ সুবিধা ফেরত পেতে বাংলাদেশকে কারখানার তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শন প্রক্রিয়ায় উন্নতি আনতে হবে। একই সাথে যে সব কারখানা শ্রম অধিকার, অগ্নিকাণ্ড ও ভবন নির্মাণে মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হবে তাদের জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোসহ আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা করতে হবে। সে বছরের জুলাইয়ে ইউরোপিয় ইউনিয়নের ট্রেড কমিশনার ক্যারেল দে গ্লুস্ট বাংলাদেশকে সতর্ক করে বলেন, শ্রম অধিকার ও কারখানা-নিরাপত্তার ব্যবস্থার উন্নতি না ঘটালে ইউরোপিয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের কর-মুক্ত ও কোটা-মুক্ত রপ্তানির সুযোগ হারাতে পারে। ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপিয় ইউনিয়ন এ বিষয়টি পর্যালোচনা সভা করবে।

রানা প্লাজা ধসের পর ১২৫টি বিক্রেতা, যাদের বেশিরভাগ ইউরোপিয় বিক্রেতা, স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা সংক্রান্ত দলিলে ‘ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে, যেখানে তা রয়েছে, কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে’ বলা হয়েছে।

এডামস বলেন, “বাংলাদেশের তৈরিপোশাক শিল্পে জড়িতদের জেগে ওঠার এখনই সময় এবং তাদের বুঝতে হবে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয় ইউনিয়ন ও তাদের দেশের সরকারের দাবি না মানলে তাদের ব্যবসা বিপন্ন হয়ে পড়বে।

“কিন্তু দুঃখজনক যে, কোন কোন কারখানার মালিক সংকীর্ণদৃষ্টি থেকে ইউনিয়নকে কারখানা নিয়ন্ত্রণে বাধা মনে করে এখনও ইউনিয়ন বিরোধী অবস্থান বজায় রেখেছেন।”

সুপারিশসমূহ

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিঃ

•   শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে তা সংশোধন করা।

•   শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং কারখানা পরিদর্শন বৃদ্ধি করা।

•   ইউনিয়েন বিরোধী কাজে জড়িত অভিযুক্ত কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা।

•   শ্রমিকদের মারধোর, হুমকি ও অপদস্থ করার সকল অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং এর জন্য দায়ীদের বিচার করা।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারারস এন্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশন-এর প্রতি

•   এসোসিয়েশনের সদস্য কারখানাগুলোয় স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে সমর্থন করা এবং তথাকথিত “ভুয়া ইউনিয়ন” গঠনকে নিরুৎসাহিত করা।

•   ইউনিয়ন বিরোধী কার্যকলাপ বন্ধে সরকারের সাথে কাজ করা।

•   স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন এবং উন্নত শ্রম সম্পর্কের সুবিধার ব্যাপারে প্রশিক্ষিত করতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা।

আন্তর্জাতিক কাপড়ের ব্র্যান্ডের প্রতি

•   বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে শ্রম অধিকার রক্ষায় উৎসাহ দান।

•   কারখানা পরিদর্শনের উন্নতিকরণ এবং কারখানাগুলো ব্র্যান্ডের  কোড অফ কন্ডাক্ট এবং বাংলাদেশের শ্রম আইন কতটা মানা হচ্ছে পরিদর্শনে সে বিষয়ক প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা।

•   কারখানা শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে অগ্নি নিরাপত্তা সম্পর্কিত আইনতসিদ্ধ চুক্তিতে বাংলাদেশকে যুক্ত করা।

শ্রমিকদের সাক্ষাকার (সম্ভাব্য প্রতিশোধ থেকে রক্ষার জন্য শ্রমিকদের পরিচয় ও কারখানার নাম উল্লেখ করা হয়নি)ঃ

কারখানা ১

নারী শ্রমিকঃ

আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল যে কারখানাটি ছিল অত্যন্ত নোংরা। একবার আমি পানি খাওয়ার পাত্রে জোঁক পেয়েছিলাম। খাওয়াদাওয়ার কোন জায়গা না থাকায় দুপুরে আমরা টয়লেটে খেতাম।

জুলাইয়ে আমরা ইউনিয়ন সংগঠিত করতে শুরু করি। আমরা যখন নিবন্ধন ফরম মালিকের কাছে নিয়ে যাই, তিনি তা ডাস্টবিনে ফেলে দেন। মালিক জানান, অনেক টাকা খরচ করে হলেও ইউনিয়ন গঠন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেবেন। তিনি বলেন, পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের ঘুষ দেবেন। তাই আমরা অনেক ভয় পেয়েছিলাম।

সেখানে সব মিলিয়ে ১৪ জন সংগঠক ছিল। তাদের মধ্যে দুজনকে মারধোর করা হয়। এক নারীর উপর বড় কাঁচি নিয়ে আক্রমণ করা হয়। ফরম জমা দেয়ার ১৫-২০ দিন পর কয়েকজন লোক আমার বাসায় আসে। তাদের মধ্যে মালিকের এক মাস্তান ভাই ছিল। কয়েকজন কারখানার কর্মকর্তা। মাস্তানটি বলেন, “তুমি যদি চাকরি না ছাড়ো তবে আমরা তোমার ভীষণ ক্ষতি করব। তাই দুই মাসের বেতনসহ তোমার টাকা নিয়ে চলে যাও।” প্রচণ্ড ভয়ে আমি পদত্যাগ পত্রে সই করি এবং টাকাটা আমাকে দেয়। যারাই মাথা তুলতে চেষ্টা বরবে তারাই বেশি কষ্ট করে।

কারখানা ২

পুরুষ শ্রমিক ১ঃ  

সহকর্মীরা আমাকে ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত করে। আমরা গোপনে সংগঠিত হতে থাকি। একদিন ফ্লোর সুপাইভাইসর ব্যাপারটি বুঝে ফেলে।তিনি আমাকে হুমকি দিতে থাকে।তিনি বলেন, “মালিকরা তোমাকে মেরে ফেলবে।” তারপর সুপারভাইসর আমাকে থাপ্পড় মারে, গালিগালাজ করে আর জানায় আমাকে চাকরি হারাতে হবে।

২০১৩ এর ২৯ সেপ্টেম্বর আমরা আমাদের ইউনিয়ন রেজিস্ট্রি করি। আমরা আমাদের চাকনি হারাইনি বটে তবে যারা ইউনিয়নের সদস্য তাদের অনেক কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। তারা আমাদের কাজে পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। কাজ শেষ করতে না পারলে তারা আমাদের অপমান করে। এই পরিস্থিতিতে আমার এক সহকর্মী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়।

পুরুষ শ্রমিক ২ঃ

ডিসেম্বরে আমরা ব্যবস্থাপনা বিভাগকে সভায় বসতে আহ্বান জানালে তারা তা অস্বীকার করে। প্রোডাকশন ম্যানেজার জানায়, “ইউনিয়ন আমাদের কোন সাহায্যে আসবে না। তাই মালিককে টেক্কা দিতে চেষ্টা করো না। যদি করো, তোমরা যাতে আর কখনো হাঁটতে না পারো সে ব্যবস্থা করবো।” ইউনিয়ন গঠনের পর থেকে আমাদের কাউকে কাউকে গালিগালাজ করা হয়েছে। সুযোগ পেলেই তারা আমাদেরকে অপমান করে।

নারী শ্রমিকঃ

সেলাই বিভাগের লাইন সুপারভাইসররা আসা-যাওয়ার সময় হুমকি দেয়, “যারা ইউনিয়নের যোগ দেবে তাদের কাপড় খুলে নেংটা করে লাথি দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়া হবে। আরেক সুপারভাইসর বলেন, প্রধান তিন ইউনিয়ন নেতা গুলি করা হত্যা করা হবে এবং গুলি করার জন্য মালিক গুপ্তঘাতক ভাড়া করার পরিকল্পনা করছে। আমরা যখন প্রোডাকশন ম্যানেজারকে এই বিষয়টি জানাই,তিনি বলেন যে আমরা কারখানায় রাজনীতি করছি। যে বলেন, কারখানায় যারা রাজনীতি করবে তাদের চাকরি থাকবে না এবং যেহেতু ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে শ্রমিকদের সব সমস্যার দায় আমাদের।

কারখানা ৩

পুরুষ শ্রমিক ১ঃ

আমরা যখন ইউনিয়ন গঠন করতে থাকি, আমাদের সাথে অনেক খারাপ আচরণ করা হয়। হুমকি দেয়ার পাশাপাশি আমাদের কাজের পরিমাণও বাড়িয়ে দেয়া হয়। ফলে আমি আমার সহকর্মীদের সাথে ইউনিয়ন নিয়ে কথা বলার সময় পেতাম না। ২০১৩ সালের জুনে ইউনিয়ন রেজিস্ট্রি করা হয়। এরপর অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। এলাকার মাস্তানরা আমাকে মারধোর করে। তারা আমাকে বলেন, আমি যেন শ্রমিকদের ইউনিয়নে যোগ দিয়ে উৎসাহ না দেই। কারখানার সামনে দুজন ম্যানেজারসহ ১০ মিলে আমাকে মারধোর করে। তারা আমাকে ইউনিয়ন ছাড়তে বলে নতুবা আমাকে মেরে ফেলা হবে বলে জানায়।

পুরুষ শ্রমিক ২ঃ

১৪ই নভেম্বর রাত সাড়ে ৯টায় কাজ শেষে আমি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন পাই। এক লোক আমার নাম ঠিক আছে কিনা এবং কারখানায় কাজ করি কিনা জানতে চায়। আমি দুবারই হ্যাঁ বলি। লোকটি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে আমি নাকি কারখানার এক প্রোডাকশন ম্যানেজারকে হুমকি দিয়েছি। আমি তা অস্বীকার করি। এরপর লোকটি আমাকে গালিগালাজ করা শুরু করে এবং বলেন- শ্রমিক নেতা হও না কেন তা ব্যাপার না, আমি যেন আর কাজে ফিরে না যাই।তিনি বলেন, “আমরা যদি তোমাকে কারখানায় দেখি তোমাকে গুলি করে হত্যা করবো।”

পরদিন সকালে আমি আমার বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তার কোনায় কয়েকজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তারা আমার পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে কারখানা পর্যন্ত আসে। এরপর একজন আমার ঘাড় ধরে আমাকে থাপ্পড় মারে।তিনি বলেন, “গতকাল রাতে তোকে বলেছিলাম কারখানায় না আসতে।“ তারপর তারা আমাকে মারতে শুরু করে। পকেট থেকে ব্লেড বের করে আমাকে শরীর চিরে দেয়। আমি সাহায্যের জন্য চেঁচাতে শুরু করলে লোকগুলো পালিয়ে যায়। আমি থানায় একটি মামলা করেছি। ইউনিয়ন থেকে কারখানার ওই জেনারেল ম্যানেজার ও প্রোডাকশন ম্যানেজারকে বরখাস্ত করার জন্য দাবি করা হয়েছে।

কারখানা ৪

নারী শ্রমিক ১ঃ

একটি বড় সমস্যা হচ্ছে আমরা বৈধ ছুটিগুলোও পেতাম না। এমনকি মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় আমাদেরকে প্রাপ্য বেতনের অর্ধেক দেয়া হতো। সব সময়েই আমাদের সাথে খারাপ আচরণ ও চিৎকার করা হতো।

জেনারেল ম্যানেজার আমাদেরকে ইউনিয়ন গঠন করতে মানা করে।তিনি বলে যে ভবিষ্যতে একটা ইউনিয়ন গঠনের অনুমতি দেয়া হবে। আমরা যে ১৫জন ইউনিয়ন গঠনে সক্রিয় ছিলাম তাদের বরখাস্ত করার হুমকি দেয়া হয়। রেজিস্ট্রি ফর্ম জমা দেয়ার পর এলাকার কিছু মাস্তান আমার বাসায় এসে আমাকে হুমকি দেয়। তারা বলেন, “কারখানার কাছে আসলে তোমার হাত পা ভেঙে দেয়া হবে।” আমি এতই ভয় পেয়েছিলাম যে এর পরে বাসা বদলিয়ে ফেলি। তারপরও আমি কারখানায় কাজ করতে যেতাম। তারা আমাকে ব্যস্ত রাখতে দ্বিগুণ পরিমাণ কাজ দেয় আর সহকর্মীদের সাথে দেখা করার অনুমতি দিত না।