"সমুদ্রের মধ্যবর্তী একটি দ্বীপে জেলখানা"

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাসান চরে স্থানান্তর

বাংলাদেশী নৌবাহিনীর নাবিকরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণ করছেন যেহেতু তারা নৌবাহিনীর একটি জাহাজ থেকে অবতরণ করছে যেটা তাদের বাংলাদেশের ভাসান চর দ্বীপে নিয়ে এসেছে, ডিসেম্বর ২৯, ২০২০। © 2020 KM Asad/LightRocket via Getty Images

সারসংক্ষেপ

২০২০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ২০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বঙ্গোপসাগরের প্রত্যন্ত পলি দ্বীপ ভাসান চরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। বর্ষা মৌসুম আসার সাথে সাথে শরণার্থী এবং মানবিক সহায়তা কর্মীরা আশংকা করছেন যে ঝড় এবং বন্যায় অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা এই দ্বীপে তাদেরকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। যেভাবে একটি শিশু বর্ণনা করেছে, এটি খাদ্য সংকট, অনির্ভরযোগ্য পানির উৎস, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং চলাচলের স্বাধীনতার উপর কঠোর বিধিনিষেধের পাশাপাশি অনেক শরণার্থী আশঙ্কা করে যে তারা "সমুদ্রের মাঝখানে একটি দ্বীপ কারাগারে" বন্দী রয়েছে

বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলিতে ভয়াবহ ভাবে ঠাসাঠাসি করে বসবাস করায় এর সমাধান হিসাবে ভাসান চরের প্রতি নজর দিয়েছে সরকারের লক্ষ্য চূড়ান্তভাবে এই দ্বীপে এক লক্ষ শরণার্থীকে স্থানান্তরিত করা।

তবে ভাসান চরে বসতি স্থাপনের জন্য নিরাপদ নয় বলে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। ব-দ্বীপ বা ডেল্টায় পলি জমা দিয়ে কেবল গত ২০ বছরে গঠিত এর আকৃতি এবং তীরগুলি বারবার স্থানান্তরিত হয়েছে। মূল ভূখন্ড থেকে নৌকায় করে তিন থেকে পাঁচ ঘন্টার সময়, প্রচন্ড বাতাসে অপ্রবেশযোগ্য বা দুর্গম এবং স্থির পাখার বিমানগুলির ওঠা-নামার জন্য সুযোগের অভাব থাকায় ঘূর্ণিঝড়ের পরিস্থিতির সময় সরে পরার জন্য ভাসান চরের সীমিত ক্ষমতা রয়েছে। কঠিন আবহাওয়ার সময়, দ্বীপটি বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে
 

২০১৭ সালে ভাসান চরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হওয়ার পর থেকে, মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞরা এই দ্বীপে শরণার্থীদের মানবিক ও নিরাপত্তা চাহিদার সহায়তা সরবরাহের সুরক্ষা নিয়ে আশংকা প্রকাশ করে উল্লেখ করেছেন যে এটি একেবারে অসম্ভব না হলেও কঠিন হবে।  বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ এবং দাতাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে স্বতন্ত্র মানবিক সহায়তা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এর জরুরিকালীন প্রস্তুতি, আবাসস্থল এবং সুরক্ষা মূল্যায়ন করার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত কোনও শরণার্থী দ্বীপে স্থানান্তরিত হবে না। কিন্তু সরকার এই প্রতিশ্রুতিগুলি পাশ কাটিয়ে স্বতন্ত্র মূল্যায়নের অনুমতি অগ্রাহ্য করে স্থানান্তরন চালিয়ে যাচ্ছে

এভাবে করে এটি (সরকার) ভাসান চরে শরণার্থীদের সহায়তা শুরু করা বা পরিণতির জন্য দায় নেয়ার জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক দাতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে এমন ভাবে উপস্থাপন করছে যে তাদের মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেইবাংলাদেশ কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে দ্বীপটি বেড়ি বাঁধ দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে এবং ঘর এবং তাদের সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্রগুলো লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীদের জন্য যা কিছু রয়েছে তার থেকে ভাল।

সরকার কর্তৃক আয়োজিত ২০২১ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের একটি ১৮ সদস্যের একটি দল এই দ্বীপে চার দিনের সফরের পরে, বাংলাদেশে জাতিসংঘ বলেছে যে তারা ভাসান চরে শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষার চাহিদার” স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তারা "ভবিষ্যতের অপারেশনাল কার্যক্রম" নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে শরণার্থীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছে কর্তৃপক্ষ তাদের অভিযোগের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছিল এবং নির্বাচিত কয়েকজনকেই এই দলের সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

জাতিসংঘ এবং দাতাদের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত যে এই দ্বীপে তাৎক্ষনিকভাবে স্থানান্তরিত করার বিষয়টি শরণার্থীদের অধিকার ও জীবন-জীবিকা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে। এটি বিশেষত জরুরি কারণ বর্ষা মৌসুমে শরণার্থী এবং কয়েক হাজার বাংলাদেশী কর্মকর্তা এবং স্বেচ্ছাসেবীরা এই দ্বীপে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ পানিতে পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা চিকিৎসা সেবা ব্যতীত আটকে থাকতে পারে যেখানে আবহাওয়াজনিত অবস্থার কারনে যাতায়াত ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ।

দ্বীপের চারপাশের বর্তমান বাঁধগুলি কেবল ৩ মিটার উঁচুতে রয়েছে, যা সম্ভবত তিন নম্বর ক্যাটেগরি বা তিন নম্বর সংকেতের ঝড় বা আরও খারাপ কোন অবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য  অপর্যাপ্ত। যদিও সরকার বাঁধের আকার ৫.৭৫ মিটার পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে, তবুও এই উচ্চতায় বাঁধগুলি বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে বড় ঝড়ের মাত্রা ধারণ করতে পারে না, যা প্রায় ৫ মিটার ছাড়িয়ে যায়- গত ৬০ বছরে কমপক্ষে ২৭ বার হয়েছে এবং কখনও কখনও এমনকি ১০ মিটার ছাড়িয়েও যায় জলবায়ু পরিবর্তনের মডেলিং পূর্বাভাস দিয়েছে যে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়গুলির ফ্রিকোয়েন্সি বা ঘটনাগুলির পুনরাবৃত্তির হার এবং তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে এবং যা ভবিষ্যতে ঝড়ের তীব্রতাগুলির জন্য এই বাঁধগুলিকে আরও বেশি অপ্রতুল করে ফেলবে

সরকার বলেছে যে এই দ্বীপে স্থানান্তরিত হওয়া দরকার কেননা মূল ভূখণ্ডের শরণার্থী শিবিরগুলিতে আরও বেশি বেশি ভিড় বেড়ে যাচ্ছে এবং স্বেচ্ছায় যারা চাইছে কেবলমাত্র সেই শরণার্থীদেরকেই সরিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে। "প্রচুর জনবহুল কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলিতে তারা অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়," পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন বলেছেন "তারা অবশ্যই ভাসান চরে জীবনকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হিসেবে খুঁজে পাবে" তিনি এমনকি দ্বীপটিকে একটি "সুন্দর রিসোর্ট" হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। ২০২০ সালের ৮ই ডিসেম্বর হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে লেখা একটি চিঠিতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে যে "সুযোগ সুবিধাগুলো নিরীক্ষা করার জন্য এবং একটি স্বাধীন ও সম্মতিগতভাবে পছন্দ করার জন্য বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা প্রতিনিধি ভাসান চরে 'যান এবং দেখুন' অবলোকন করার পরেই স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি সম্পূর্নভাবে স্বচ্ছ এবং স্বেচ্ছায় সংঘটিত হয়েছিলঃ

স্বাস্থ্যসেবা সহ ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের যেন সকল আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলি সরবরাহ করা হয় তার জন্য বাংলাদেশ সরকার কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে ১৩,০০০ একর দ্বীপে সারাবছর মিষ্টি জল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ, কৃষি জমি, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, দুটি হাসপাতাল, চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, গুদামঘর, টেলিযোগাযোগ পরিষেবা, একটি পুলিশ স্টেশন, বিনোদন ও শিক্ষা কেন্দ্র, খেলার মাঠ এবং আরও অনেক কিছু রয়েছে

মানবিক সহায়তাকারী বিশেষজ্ঞ সহ শরণার্থীদের নিয়ে ১৬৭ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, সরকার ভাসান চরের শর্ত সম্পর্কে রোহিঙ্গা শরণার্থী সম্প্রদায় এবং দাতাদের বিভ্রান্ত করেছে। কিছু শরণার্থীকে অবহিতকরন সম্মতি ছাড়াই স্থানান্তর করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যান্যরা সম্মত হন যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলি ক্যাম্পগুলির তুলনায় সর্বোত্তম এবং সেখানে প্রচুর খোলামেলা জায়গা রয়েছে, তবে খাদ্য সংকট, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষার সুযোগ নেই, চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ এবং জীবিকার সুযোগের অভাবের কথাও জানিয়েছেন।

আজারা, ৬৫, হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছিলেনঃ

তারা আমাদের ভাল খাবার এবং ভাল স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রলুব্ধ করেছিল। আমরা বৃদ্ধ মানুষ। আমরা এখানে এসেছি যেন আমরা কাজ করতে পারি এবং উপার্জন করতে পারি এবং আমাদের সহযোগীতা করার জন্য আর অন্যের প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু এখানে আসার পরে আমি দেখতে পাচ্ছি যে আমাদের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা, ভাল ঔষুধপত্র বা যথাযথ উপযোগীতাগুলো দেওয়া হচ্ছে না এমনকি আমাদেরকে সরবরাহ করা চালও পর্যাপ্ত নয়। স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি আমাদের আশ্রয়স্থল থেকে অনেক দূরে যেখানে আমাদের পায়ে হেঁটে যেতে প্রয়োজন হবে। আমি স্বাস্থ্যসেবা সুবিধায় চারবারের বেশি গিয়েছি, তবে তারা সঠিক ঔষুধপত্রের নির্দেশনা দেয় না।

এই সমস্যাগুলি সমাধান করার পরিবর্তে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে কঠোড় ব্যবস্থা বা ক্র্যাক ডাউন করছে যারা কথা বলতে বা দ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। কিছু শরণার্থী অভিযোগ করেছে যে সকল স্থানান্তর স্বেচ্ছায় হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকারের দাবিকে বিরোধিতা করে তাদের আত্মীয়দের চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদেরকে নির্বিচারে আটক করা হয়েছে এবং মারধর করা হয়েছে। শরণার্থীরা আরও বলেছিল যে তাদের প্রাঙ্গণের বাইরে যাওয়ার কারনে তাদের মারধর করা হয়েছিল। এপ্রিল মাসে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছিলেন যে, একজন বাংলাদেশী নাবিক অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলতে খেলতে অন্য ব্লকে চলে যাওয়ার কারনে একদল শিশুকে একটি শক্ত প্লাস্টিকের পিভিসি পাইপ দিয়ে মারধর করেছিলেন।

জাতিসংঘ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারদের এমন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা উচিত যে বাংলাদেশ যেন নিশ্চিত করে যে দ্বীপে ব্যক্তিরা ঝুঁকিতে না পড়ে, শরণার্থীদের অধিকারকে সম্মান করা হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর যারা নির্যাতন করবে তাদের যেন জবাবদিহি করতে হয়। জাতিসংঘ হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছে এবং সম্প্রতি চালু হওয়া জয়েন্ট রেসপন্স প্লান বা যৌথ কার্যক্রম পরিকল্পনায় নিশ্চিত করেছে যে তারা ভাসান চরের ভবিষ্যতে যে কোনও মানবিক সহায়তামূলক  কার্যক্রমের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনা করতে চেয়েছে

বাংলাদেশ সরকার প্রায়শই জাতিসংঘের সাথে এ ধরনের কার্যক্রম সাজায় এবং বিলম্ব করে এবং তৎক্ষণাৎভাবে নীতি ও প্রযুক্তিগত উভয় ক্ষেত্রেই বরং এই পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। এদের দ্বীপের আবাসস্থলতা এবং জরুরি প্রস্তুতির স্বতন্ত্র মূল্যায়নের জন্য নিজের প্রতিশ্রুতিগুলি মেনে চলা উচিত এবং যদি এটি অনিরাপদ বা অরক্ষিত বলে বিবেচিত হয় তবে কক্সবাজারে শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনা সহ যে কোনও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার সমন্বয় করা উচিত। এর মধ্যে, যে কোনও শরণার্থী যদি কক্সবাজারে ফিরে আসতে চান তাদের অবিলম্বে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া উচিত।
 

রোহিঙ্গা: একটি দুর্ভোগের ইতিহাস

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এই ক্রমাগত আগমন মোকাবিলার ভার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের উপর পড়েছে, আর এই সংকটের দায়বদ্ধতা মিয়ানমারের উপর পড়ে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বড় আকারের হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, এবং অন্যান্য অত্যাচার যা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মত কার্যকলাপ কে বাড়িয়ে দেয় সার্বিক ভাবে এই চলমান মানবিক সংকটের তৈরি করেছে এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অত্যাচারকে মোকাবেলায় কোনও অর্থবহ পদক্ষেপ গ্রহণ, জাতিবিদ্বেষ, নিপীড়ন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কয়েক দশকব্যাপী চলে আসা বৈষম্য ও নির্যাতনের অবসান ঘটাতে মিয়ানমারের ব্যর্থতা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনের বিলম্বের মূল কারণ।

২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার “নন-রিফউলমেন্ট” (nonrefoulement)- নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে অর্থাৎ শরণার্থীদের এমন কোন স্থানে প্রত্যাবর্তন করা হবেনা যেখানে তারা নির্যাতনের মুখোমুখি হতে পারে। শরণার্থীদের যারা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাথে কথা বলেছে তারা মিয়ানমারে তাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য ইচ্ছা অত্যাধিকভাবে প্রকাশ করে, যদি তা নিরাপদ হয়ে থাকে, তাদের নাগরিকত্ব এবং চলাচলের স্বাধীনতা থাকবে এবং নৃশংসতার জন্য সত্যিকার অর্থে জবাবদিহিতা থাকবে "বাংলাদেশ আমার দেশ নয়," কাদির আহমেদ, ২৪, বলেছেন। "আমি আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই। মিয়ানমার সরকার যদি আমাদের হত্যা ও নির্যাতন না করত তবে আমরা ছেড়ে যেতাম না।

২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে, দেশটি একই জেনারেলদের দ্বারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত, যারা ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণ-নৃশংসতার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে
 

ভাসান চরে কোয়ারেন্টিন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন

ভাসান চরে বসবাস শুরু করা প্রথম শরণার্থীরা যাদের সমুদ্র থেকে উদ্ধার করার পরে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। ২০২০ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাগরে হারিয়ে যাওয়া ৩০৬ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী বহনকারী দুটি নৌকা উদ্ধার করে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাই এবং মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষগুলি এর আগে শরণার্থীদের তীড়ে আসার অনুমতি প্রত্যাখান করেছিল

যখন প্রতিবেশী দেশগুলো শরনার্থীদের অগ্রাহ্য করে, বাংলাদেশ তখন তাদের উদ্ধার করেছিল, এটি একই সাথে প্রশংসনীয় এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি বৈশিষ্ট্য। এক মাস আগে, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ৩৯০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আরও একটি নৌকা উদ্ধার করেছিল যেটিকে মালয়েশিয়া থেকে ফিরিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। শরনার্থীরা বাংলাদেশ উপকূলে ফিরে আসার আগে সমুদ্রে ভেসে ভেসে কয়েক মাস ধরে ক্ষুধার্ত, পানিশূন্য ও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল। বেশ কয়েকজন মারা গিয়েছিলেন, যাদের লাশ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

তবুও, ৩০৬ জনকে তীরে আনার পরে, শরণার্থীদেরকে পূর্বের মতো কক্সবাজারে তাদের পরিবারের সাথে পুনর্মিলন করার পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ভাসান চরে নিয়ে গিয়েছিল। কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে বলেছিলেন যে শরণার্থীদের কেবল শিবিরগুলিতে কোভিড -১৯ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্য ভাইরাস থেকে রক্ষা করার জন্য সাময়িকভাবে রাখা হয়েছিল। তবে পুরো এক বছর পরেও শরণার্থীরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এখনো এই দ্বীপে আটক হয়ে আছেন। ৪৩ বছর বয়সী ইউসুফ আলী, যিনি কক্সবাজারের বাসিন্দা এবং যার দুই মেয়ে ভাসান চরে আটক রয়েছেন, তিনি বলেছিলেন, “সিআইসি [ক্যাম্প-ইন-চার্জ কর্মকর্তা] আমাদের বলেছিলেন যে আমাদের মেয়েদের এখানে আমাদের কাছে আর ফিরিয়ে নিয়ে আসা হবে না। তারা বলেছিলেন, ‘এখনও আপনার কাছে সেখানে [ভাসান চরে] যাওয়ার অভিমত দেয়ার সময় আছে, অন্যথায় মেয়েদের ভুলে যান।"

কক্সবাজারে কয়েক মাস ধরে তাদের পরিবারে ফিরে আসার আর্জি জানানোর পরে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে একদল শরণার্থী অনশন শুরু করেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রাপ্ত ভিডিও অ্যাকাউন্টে, অনশন ধর্মঘটে এক রোহিঙ্গা নারী বলেছিলেন: "আমরা খাবার চাই না, আমরা যা চাই তা হল আমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হবে...... এখানে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল“ জবাবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ শরণার্থীদের কয়েকজনকে গাছের ডাল ও রাবারের লাঠি দিয়ে মারধর করে।

২০২১ সালের ২৮শে এপ্রিল, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সমুদ্রপথে আরও ৩০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে উদ্ধার করে কক্সবাজারে তাদের পরিবারের সাথে পুনরায় মিলিত না করে ভাসান চরে প্রেরণ করে।
 

কক্সবাজার থেকে স্থানান্তর

সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা প্রথম শরণার্থীর দলকে ভাসান চরে আনার পরে বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলি থেকে দ্বীপে শরণার্থীদের ব্যাপক আকারে স্থানান্তর শুরু করে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলি থেকে হাজার হাজার অন্যান্য শরণার্থীদের ভাসান চরে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছে যে এটি "ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের জন্য উপযুক্ত স্যানিটেশন এবং চিকিৎসা সুবিধার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।" সরকার হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে আরও বলেছে:

স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার বা অংশীদারদের সাথে পরামর্শ করে সম্পন্ন করা হয়েছিল। জাতিসংঘের প্রশ্নের ভিত্তিতে কয়েক দফায় আলোচনারও ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং আমরা আশা করি যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘ, তাদের নিজস্ব অনুমোদন অনুসারে শিগগিরই এই প্রক্রিয়াতে যুক্ত হবে।

২রা ডিসেম্বর জাতিসংঘ একটি বিবৃতিতে অবশ্য বলেছিল যে এটি জড়িত ছিল না এবং "ভাসান চরে কোনও স্থানান্তরিত করার আগে ব্যাপক প্রযুক্তিগত সুরক্ষা মূল্যায়ন করা উচিত," আরও পুনর্ব্যক্ত করে যে জাতিসংঘ এ জাতীয় মূল্যায়ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল "যদি সরকার অনুমোদন দিয়ে থাকে" জাতিসংঘ আরও বলেছে যে কোনও স্থানান্তর স্বেচ্ছায় নিশ্চিত করার জন্য সরকার তার প্রতিশ্রুতির প্রতি মর্যাদা দেয়া উচিত

যদিও সরকার বলেছে যে সকল স্থানান্তরের বিষয়টি অবহিতকরন সম্মতির ভিত্তিতে করা হয়েছে, কিছু শরণার্থী হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছিল যে তারা নিজের ইচ্ছায় যেতে চায়নি

কয়েকজন শরণার্থী এমনকি জোরপূর্বক স্থানান্তরিত হওয়ার ভয়ে কক্সবাজার ক্যাম্প গুলো থেকে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়া এমন ৫৩ বছর বয়সী কবির আমাদের বলেছিল:

আমার নাম তালিকায় প্রকাশিত হওয়ায় সিআইসি এখন আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছে, যেহেতু আমার নাম আছে, তাই আমাকে অবশ্যই যেতে হবে। তিনি বলেছিলেন, আমি মারা গেলেও তারা আমার দেহটি সেখানে [ভাসান চরে] নিয়ে যাবে। আমি সেই দ্বীপে যেতে চাই না

অন্যরা বলেছিল যে তাদের সরিয়ে নেয়ার জন্য বিভ্রান্তিমূলক তথ্য এবং প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল। আনজুল (৪০) বলেছেন:

তারা আমাদের অনেক অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফাঁদে ফেলেছিল তারা বলেছিল যে আমাদের ভাল খাবার এবং প্রচুর জীবিকার সুযোগ থাকবে যেমন গবাদি পশু লালন পালন, মাছ ধরা, বা মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত করার মতো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হল, আমরা যখন বাসে উঠলাম তখন তারা আমাদের প্রত্যেককে ৫০০০ টাকা (ইউএস ডলার ৬০) করে দিয়েছিল এবং প্রতি মাসে আমাদের ৫,০০০ টাকা করে দেওয়া হবেও বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরে এ ধরনের কোন সুযোগ নেই এবং এখন আমরা খাদ্য ঘাটতির সংকটে পড়ছি।

ভাসান চরের একাধিক শরণার্থী বলেছিলেন যে তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা প্রত্যাখান করা হচ্ছে এবং দ্বীপে মোতায়েন করা নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়শই অন্যায় আচরণ করেছিল অন্যরা অভিযোগ করেছেন যে তারা খাদ্যের অভাবের মুখোমুখি হয়েছেন এবং শিশুরা সহ অসুস্থ ব্যক্তিরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবার অভাবে মারা যাচ্ছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১৪ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছিল যারা এই দ্বীপে চিকিৎসা সেবা চেয়েছিল, তাদের সকলেই বলেছিল, তারা যে সুযোগ সুবিধাগুলি এবং যত্ন গ্রহণ করেছিল তা অপর্যাপ্ত ছিল চারটি ঘটনার ক্ষেত্রে, যখন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পরবর্তিতে চিহ্নিত করে, পরিবারের সদস্যরা বলেছিলেন যে তাদের স্বজনরা সেবার অভাবে মারা গিয়েছিলেন। আনজুল বলেছিলেন, “ক্যাম্পে [কক্সবাজারে], আমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা কমপক্ষে একজন চিকিৎসক বা হাসপাতালে যেতে পারতাম অথবা এনজিওগুলি [বেসরকারী সংস্থাগুলি] উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারত, তবে এখানে যখন আমাদের লোকজন মারা যাচ্ছে, কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না।

অনেক শরণার্থী অভিযোগ করেছিলেন যে তাদের আলসার, বুকে ব্যথা, ডায়াবেটিস এবং হাঁপানি সহ স্বাস্থ্যগত সমস্যার জন্য কেবল প্যারাসিটামল (অ্যাসিটামিনোফেন) দেওয়া হয়েছিল। যাদের জরুরী চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন তাদেরকে টাকা দিতে হত এবং মূল ভূখণ্ডের হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হত, যেখানে সমুদ্র বা স্থল পথে যেতে অন্তত পক্ষে পাঁচ ঘন্টা সময় লাগত। দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌকা বা হেলিকপ্টার দ্বারা এ ধরনের পরিবহন প্রায় অসম্ভব। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ চারটি ঘটনার অনুসরণ করে ছিল, যার মধ্যে শরণার্থীরা বিশ্বাস করে ছিল যে জরুরী ভাবে স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ গ্রহনে একেবারেই অপর্যাপ্ততার কারণে পরিবারের একজন সদস্য মারা গিয়েছিলেন, তন্মধ্যে একজন নারী সন্তান প্রসবের সময় মারা গিয়েছিলেন।

শরণার্থীরা আরও বলেছে যে তাদের পরিবারগুলি অনিয়মিত এবং অপর্যাপ্ত খাবারের রেশন পেয়েছে। ইউসুফ (৪৭) বলেছেন,

খাবারের রেশন প্রতি মাসে পরিবর্তিত হয় এবং কখনও কখনও আমাদের দেওয়া রেশনটির পরিমাণ এবং গুণমান অনেক কম বেশি হয়পরিবারগুলি প্রায়শই পচা পেঁয়াজ, আদা বা রসুন পান যা তারা রান্নার জন্যও ব্যবহার করতে পারে না। জনপ্রতি ব্যক্তি হিসেব করে চাল বিতরণ করা হয়, তবে আপনার পরিবার যত বড়ই হোক না কেন অন্যান্য জিনিস গুলির জন্য পরিবার প্রতি পরিমাণ একই থাকে

দ্বীপের পরিস্থিতি অনুভব করার পরে কয়েকশ শরণার্থী চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কক্সবাজারে পালিয়ে আসা ১৭ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীর সাথে কথা বলেছিল। ৩২ বছর বয়সী শাহ আলম হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছিলেন যে, তিনি চলে গেছেন কারণ "এই দ্বীপে জীবনের কোনও নিরাপত্তা নেই।"

২০২১ সালের এপ্রিলে, শিশুসহ একদল শরণার্থী পালানোর চেষ্টা করলে কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করে। আটককৃত রোহিঙ্গাদের দু'জনের পরিবার জানিয়েছে যে তাদের আত্মীয়দের অবস্থান সম্পর্কে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই। ১২ই এপ্রিল, আটককৃত শিশুদের একজন ফারুক (১৭), হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছে, “কিছুদিন আগে আমার ভাই আমাকে একজন পুলিশ কর্মকর্তার মোবাইল থেকে ফোন করেছিল এবং বলেছিল যে তাদেরকে দ্বীপ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, তবে আমার ভাই বলতে পারেননি সে কোথায় ছিল তার পর থেকে আমরা তার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারিনি।

তারা আরও বলেছে যে পুলিশের পরিচয় দিয়ে দাবি করা অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিরা তথ্য দেওয়ার জন্য ঘুষ দাবি করেছিলেন। আটক হওয়া শরণার্থীদের একজনের মা তসলিমা (৪০) বলেছিলেন যে, পুলিশ অফিসার পরিচয় দিয়ে দাবি করা একজন হুমকি দিয়ে বলেন, তার পরিবার

ঘুষ না দিলে বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ডের জন্য বাংলাদেশে প্রচলিত "ক্রসফায়ারে" তার ছেলেকে হত্যা করা হবে "তিনি আমাদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে আমাদের নগদ অর্থ প্রস্তুত রাখা উচিত, অথবা তারা আমার ছেলেকে ক্রসফায়ারের টার্গেট করবে," তিনি বলেছিলেন। আমরা বলেছিলাম যে আমরা টাকা দিতে পারব না এবং জিজ্ঞাসা করলাম আমার ছেলে এখন কোথায়? লোকটি বলল, ‘আগে টাকা দাও, তবে তোমার ছেলে নিরাপদে থাকবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে যে দ্বীপের সদ্য নির্মিত থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিরাপত্তা বাহিনী শরণার্থীদের মারধর করেছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদকালে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন: "আপনার রোহিঙ্গাদের বলুন যে তারা যদি এখান থেকে পালানোর কথা ভেবে থাকে তবে তাদের ভাগ্যে একই অবস্থা হবে।" নিখোঁজদের শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষ ভাসান চরের ঘর বাড়িতেও অভিযান চালিয়ে ছিল এবং তথ্য পাওয়ার জন্য বাসিন্দাদের মারধরও করেছিল জোরিনা নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছে যে এই অভিযান পরিচালনাকারীদের মধ্যে একজন কর্মকর্তা শরণার্থীদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, “আপনাদের কক্সবাজারে ফিরে যাওয়ার কোনও আশা নেই। আপনাদের পরিবারদেরকেও এখানে নিয়ে আসা হবে। ফিরে যাওয়ার এমনকি কোন স্বপ্নও দেখবেন না।

জাতিসংঘ এবং দাতাদের ভূমিকা

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল ভাসান চর প্রদর্শনের জন্য বিদেশী মিশন প্রধানদের জন্য একটি সফরের ব্যবস্থা করেছিল।

এই সফরটি অত্যন্ত উদ্দেশ্যজনক ভাবে সাজানো নাটকের মত ছিল এবং কর্মকর্তারা শরনার্থীদের সাথে নির্দ্বিধায় মেলামেশা করতে সক্ষম হননি। দ্বীপটিতে আসা কূটনীতিকরা জনসমক্ষে কোন মন্তব্য করেননি, যদিও দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন যে তারা প্রায় ৪০ জন বাছাই করা” রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে দেখা করতে পেরেছিলেন এবং তারা কেবলমাত্র বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাদের সাথে কথা বলতে পেরেছিলেন।

দ্বীপের একজন শরণার্থী পরবর্তীতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছিলেন: প্রতিনিধি দলের সাথে আমাদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। আমরা যদি তাদের সাথে দেখা করতে সক্ষম হতাম, তবে আমাদের বলার মতো অনেক কিছুই থাকত এবং আমরা কক্সবাজারের ক্যাম্প গুলিতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য তাদের সাহায্যের জন্য অনুরোধ করতাম।

কূটনীতিকদের কোন ধরনের উদ্বেগ নেই এমন দাবি করার জন্যে বাংলাদেশ সরকার অবশ্য এই সফরটিকে নিজ সুবিধার্তে কাজে লাগিয়েছে। ৩রা এপ্রিল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, “রাষ্ট্রদূতরা নির্দ্বিধায় রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন এবং তাদের মতামত ও আশা ব্যক্ত করেছেন।“

১৮ সদস্যের জাতিসংঘের একটি দল ১৭-২০শে মার্চ  এর মধ্যে এই দ্বীপটি পরিদর্শন করেছে। শরণার্থীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছিল যে তারা কেবলমাত্র বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই কথা বলার অনুমতি পেয়েছিল এবং দ্বীপে যেন কোনও সমস্যা নেই এমন ভাবে বলার জন্য তাদের সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। একজন শরণার্থী, রশিদ (৩৮) বলেছেঃ

জাতিসংঘের দলটি ১৭ই মার্চ এখানে আসার আগে, কর্তৃপক্ষ আমার দলের কিছু শরণার্থীকে ডেকেছিল এবং আমাদের বলতে আদেশ করেছিল যে আমরা প্রতিমাসে নিয়মিত ৫০০০ টাকা করে পাচ্ছি, আমরা এখানে যে খাবার পাচ্ছি তা ক্যাম্পের চেয়ে অনেক বেশি, এবং এখানকার স্বাস্থ্য সুবিধা খুবই আধুনিক।

জাতিসংঘের দল এই দাবিগুলো আক্ষরিক হিসেবে গ্রহণ করে ছিল এবং সুপারিশ করেছিল যে, "ভবিষ্যতের যে কোনও স্থানান্তর ক্রমান্বয়ে এবং পর্যায়ক্রমে গৃহীত করা, যা ভাসান চরে প্রাপ্ত প্রশাসনিক কাঠামো, সুযোগ-সুবিধাগুলি ও সেবাসমূহ সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রয়োজনীয়তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

এটি জাতিসংঘ এবং দূতাবাসগুলির পূর্বের বক্তব্য গুলির সাথে বৈপরীত্য তৈরী করে যেখানে তারা বারবার বাংলাদেশ সরকারকে জোর দিয়ে বলে যে কোনও শরণার্থীকে ভাসান চরে স্থানান্তরিত করা উচিত না যতক্ষণ না এটির বসবাস যোগ্যতা সম্পর্কে স্বাধীন বিশেষজ্ঞের দ্বারা প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন করা না হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এ দ্বীপটি দেখার পরে, মিয়ানমারের তৎকালীন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াঙ্গি লি বলেছিলেন, “আমার সফর শেষে এখানে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা আমার কাছে অজানা থেকে যায়, তবে সেগুলোর মধ্যে প্রধান হলো, এই দ্বীপটি সত্যিকার অর্থেই বসবাসযোগ্য কিনা।

২০২১ সালের ১৮ই মে, ইউএনএইচসিআর তার ২০২১ রোহিঙ্গা যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা বা রোহিঙ্গা জয়েন্ট রেসপন্স প্লান চালু করে যেটি বলেছিল যে ভাসান চরে তাদের সফরের সময়, "জাতিসংঘের দল ভাসান চরের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সুযোগ-সুবিধা এবং সেখানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করার সম্ভাব্যতা দেখেছিল" এবং "সফরের প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে, জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন পরিচালনা ও কল্যাণ সাধনের কাঠামো সহ ভাসান চরের বিষয়ে জাতিসংঘের ভবিষ্যত পরিচালনা সংক্রান্ত আরও আলোচনায় অংশ নিতে সম্মত হয়েছে।

 

সুপারিশসমূহ

বাংলাদেশ সরকারের প্রতি

২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূলকরণের সহিংস অভিযান পুনরারম্ভ করার পর বাংলাদেশ সরকার একটি হতাশাগ্রস্থ সম্প্রদায়কে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে উদার ও সহানুভূতিশীল ছিল মিয়ানমার এখনও নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের শর্ত তৈরি করতে না পারার কারণে তাদের অবস্থান দীর্ঘায়িত হলেও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের উপলব্ধি করে নেয়া উচিত যে এই পরিস্থিতির জন্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দোষ দেয়া উচিত নয়, এবং নিশ্চিত করা উচিত যে তাদের অধিকার সমূহ সুরক্ষিত রয়েছে।
 

ভাসান চরে অবস্থানরত শরণার্থীদের জীবন ও অধিকার রক্ষা করার জন্য

  • যে কোনও শরণার্থী যারা কক্সবাজারে ফিরে আসতে চান তাদের চলে আসার অনুমতি দিন এবং পরিবহন সরবরাহ করে সহায়তা করুন।
  • ভাসান চরের সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং বসবাস যোগ্যতার স্বাধীন মূল্যায়ন করার জন্য মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞদের তাৎক্ষনিক এবং নিরবিচ্ছিন্ন সুযোগের অনুমতি দিন। দ্বীপটিতে জীবনের নিরাপত্তা এবং টিকে থাকার জন্য জাতিসংঘ বারবার প্রযুক্তিগত এবং সুরক্ষা মূল্যায়নের প্রস্তাব করেছে।
  • যদি একটি স্বাধীন পর্যালোচনায় দেখা যায় যে অবকাঠামোগত ত্রুটিগুলির কারণে বর্ষার সময় জীবন-যাপন ঝুঁকিতে পড়তে পারে তবে ভাসান চরে অবস্থানরত সকল রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশিদের তাৎক্ষণিকভাবে মূল ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন।
  • ভাসান চরের শরণার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে, এটি নিশ্চিত করতে, নিরাপত্তা এবং নীতিগত মানগুলির বিষয়ে একমত হতে অবিলম্বে ইউএনএইচসিআর এর কর্মকর্তাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করুন।
  • সম্পূর্ণ বিবরণ অনুসারে দ্রুত বাঁধ প্রসারিতকরণ, উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা;এবং জরুরী ব্যবস্থাপনা এবং প্রশমন পরিকল্পনা তৈরী করা অন্তর্ভুক্ত রেখে জলবায়ু সম্পর্কিত ঝুঁকি নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবনা অনুসারে কাজ করুন।
  • মূল ভূখণ্ড থেকে লজিস্টিকস এবং শিপিং এর জন্যে বর্ধিত ধারণক্ষমতার সাথে ভাষান চরে প্রয়োজনীয় সরবরাহ এবং পণ্য বজায় রাখার জন্য কার্যপ্রণালী সমূহের উন্নয়ন সাধন করুন।
  • শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী এবং বয়স্ক ব্যক্তিসহ যাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদা এবং দুর্বলতা রয়েছে তাদের সুরক্ষার বৃদ্ধির জন্য ভাসান চরের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উচিত জাতিসংঘের দেয়া সুপারিশ সমূহ অনুসারে কাজ করা।
  • জরুরি সেবা এবং ডায়াগনস্টিক সেবা সমূহসহ পর্যাপ্ত কর্মী ও সরবরাহ নিয়ে সব রকম চিকিৎসা সুবিধা চালু করুন।
  • প্রস্তাবিত শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ চালু করুন।
  • নৌবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীর পরিবর্তে ভাসান চরে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরামর্শমূলক প্রশাসনের জন্য বেসামরিক কর্তৃপক্ষ মোতায়েন করুন। নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক হয়রানির অভিযোগ অনুসন্ধান করুন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নিন।
  • মাঝি এবং ক্যাম্প-ইন-চার্জ (সিআইসি) সহ স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করুন যে ভাসান চরে হওয়া সকল স্থানান্তর স্বেচ্ছায় হতে হবে এবং সম্পূর্ণ এমন তথ্যের উপর ভিত্তি করে হতে হবে যে, দ্বীপে জীবন যাপনের অবস্থা রয়েছে এবং সেখানে শরণার্থীদের অধিকার এবং সেবা পাবার সুযোগ থাকবে।
  • এ বিষয়টি নিশ্চিত করুন যে সমুদ্র পথে উদ্ধার হওয়ার পরে ভাসান চরে অনিচ্ছাকৃত ভাবে আটক থাকা ৩০০ শরণার্থীদের জাতিসংঘের সুরক্ষা কর্মীদের কাছে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে
  • সমুদ্র পথে পাওয়া ৩০০ জনেরও বেশি শরণার্থীকে তাৎক্ষনিক ভাবে কক্সবাজারে তাদের পরিবারের সাথে পুনরায় একত্রিত করুন।
  • নিশ্চিত করুন যে সকল শরণার্থীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবাসহ মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সেবা এবং প্রয়োজনীয় ঔষুধের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে।
  • আশ্রয়, খাদ্য, জল, চিকিৎসা সেবা, প্রয়োজনীয় ঔষুধ এবং জরুরি স্বাস্থ্য সেবার জন্য পরিবহনের বিধানের বিবরণসহ ভাসান চরে বড় ঝড়ের প্রবণতার ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কিত পরিকল্পনাটি জনসমক্ষে প্রকাশ করুন।
  • সমস্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আইনী মর্যাদা এবং নথিপত্র সরবরাহ করুন যা তাদের শরণার্থী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।
  • সকল শিশুকে বৈষম্য ছাড়াই মান সম্মত শিক্ষার সুযোগ সরবরাহ করুন।
  • চলাচলের স্বাধীনতা এবং জীবিকার জন্য শরণার্থীদের অধিকারকে সম্মান করুন।
  • শরণার্থী ক্যাম্প গুলিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব সহ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করুন যা মানবিক সহায়তা পাওয়ার অধিকার সংক্রান্ত সনদ এবং নূন্যতম মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার মানদণ্ড (এসপিএইচইআরই স্ট্যান্ডার্ড) গুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ।
  • ভাসান চরে কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণ বন্ধ করুন যা চলাচলের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন গুলোকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
  • পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু প্রশমন কার্যক্রম এবং অবকাঠামো উন্নয়নে শরণার্থীদের নিযুক্ত করুন যা শরণার্থী এবং স্থানীয় জনগন উভয়কেই উপকৃত করবে।

কক্সবাজারে শরণার্থীদের জীবন ও অধিকার রক্ষা করতে

  • শরণার্থী ক্যাম্প গুলিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব সহ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করুন যা মানবিক সহায়তা পাওয়ার অধিকার সংক্রান্ত সনদ এবং নূন্যতম মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার মানদণ্ড (এসপিএইচইআরই স্ট্যান্ডার্ড) গুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ।
  • কোভিড ১৯ এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে বিধি নিষেধের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া মানবিক সহায়তার সেবাসমূহ এবং শিক্ষার সুযোগ পুনরায় চালুর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
  • ক্যাম্প গুলিতে ফোন এবং ইন্টারনেট সুবিধা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা সহ শরণার্থীদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্বিচারে নিষেধাজ্ঞার সমাপ্তি করুন।
  • ক্যাম্প গুলিতে জরুরি অবস্থাকালীন সময় চলাচলের স্বাধীনতাকে অস্বাভাবিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে এমন কাঁটাতারের বেড়া দেয়া বন্ধ করুন।
  • আগুনের ঝুঁকি নেই এমন সামগ্রী ব্যবহার করে আশ্রয় কেন্দ্র গুলি নির্মাণের অনুমতি দিন যেগুলো বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
  • বিচার বহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং শরণার্থীদের নির্বিচারে আটকের জন্য দায়ী পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষ ভাবে তদন্ত করুন ও যথাযথভাবে বিচার এর মুখোমুখি করুন।
  • শরণার্থীদেরকে, বিশেষত সংখ্যালঘু খ্রিস্টান এবং হিন্দুদেরকে উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীদের লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে বাঁচাতে ক্যাম্প গুলিতে নিরাপত্তা বাড়ান।
  • ক্যাম্প গুলির মধ্যে গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোকে উৎসাহিত এবং সহায়তা করুন যা পরিষেবা, স্থানান্তর, প্রত্যাবাসন, ত্রাণ, এবংউন্নয়নের বিষয়ে শরণার্থীদের পরামর্শকে ত্বরান্বিত করে এবং যা নারী, প্রতিবন্ধী এবং অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠী গুলিকে মত প্রকাশের সুযোগ করে দেয়।
  • পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু প্রশমন কার্যক্রম এবং অবকাঠামো উন্নয়নে শরণার্থীদের নিযুক্ত করুন যা শরণার্থী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়কেই উপকৃত করবে।
  • ভিসা সংক্রান্ত কঠোর বিধি নিষেধ, প্রকল্প অনুমোদন এবং অন্যান্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা প্রদানকারী ও উন্নয়ন সংস্থা গুলির কাজকে সহজতর করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
  • ১৯৫১ সালের শরণার্থী সম্মেলন বা রেফিউজি কনভেনশন, এর ১৯৬৭ সালের প্রোটোকল এবং ১৯৫৪ এবং ১৯৬১ সালের রাষ্ট্রহীনতা সম্মেলন বা স্টেটলেসনেস কনভেনশনকে অনুমোদন করুন এবং এগুলি বাস্তবায়নের জন্য আইন প্রণয়ন করুন।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং ইউএনএইচসিআর-এর সাথে স্বাক্ষরিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তথ্য পরিবেশন [Data Sharing] ও প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক প্রকাশ করুন।
  • শরণার্থীদের সম্পর্কে কোন তথ্য যাচাইকরণ এবং প্রত্যাবাসন সম্পর্কে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে কোন তথ্য পরিবেশন [Share] করা হবে তা নির্ধারণ করার সময় গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত এবং নিরাপত্তার অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
     

মিয়ানমার রাজ্য প্রশাসন কাউন্সিল জান্তার প্রতি

২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার সেনাবাহিনী একটি অভ্যুত্থান পরিচালনা করে এবং জাতীয় এবং রাজ্য পর্যায়ের সরকারের অনেক বেসামরিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। রাজ্য প্রশাসন কাউন্সিল জান্তার উচিত অবিলম্বে অপব্যবহার বন্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে পুনরুদ্ধার করা উচিত, যেগুলোর মধ্যে আরও রয়েছেঃ

  • অবিলম্বে এবং নিঃশর্ত ভাবে সকল নির্বিচারে আটককৃত ব্যক্তিদের মুক্তি দিন।
  • সামরিক আইন ঘোষণার মতো সামরিক ভাবে নির্যাতন গুলির ভিত্তি স্থাপনকারী জাতীয় ও স্থানীয় আদেশ সমূহ, এবং "জরুরি অবস্থা" বাতিল করুন।
  • বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার থামানোর জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিন।
  • ২০২০ সালের নভেম্বরে যথাযথ ভাবে নির্বাচিত সংসদকে স্বীকৃতি দিন এবং গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারের দ্বারা কোনও নতুন সংবিধান গ্রহণে হস্তক্ষেপ করবেন না।
  • ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশনের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলির বেসামরিক নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করুন।
     

জাতীয় ঐক্য সরকারসহ মিয়ানমারের বেসামরিক নেতৃত্বের প্রতি

২০২০ সালের নভেম্বরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিয়ানমারের সংসদ সদস্যরা অভ্যুত্থানের পর থেকে দুটি প্রতিনিধি সংস্থা গঠন করেছেনঃ পাইডাংসু হাল্টাও (সিআরপিএইচ) এবং জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) প্রতিনিধিত্বকারী কমিটি। ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক, অধিকারকে-সম্মান করবে এমন মিয়ানমারের জন্য নীতিমালা তৈরি এবং তাদের দূরদর্শিতার রূপরেখা প্রদানের ক্ষেত্রে, এই সংস্থাগুলির উচিত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষা করা এবং কয়েক দশক ধরে চলমান অত্যাচার-নির্যাতনের নীতিগুলি উল্টে দেওয়া। দেশে বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে যেসব ব্যবস্থা গুলি কৌশলগত ভাবে বিকাশ ও কার্যকর ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত সেসব কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • বর্ণবাদ, নিপীড়ন এবং স্বাধীনতার মারাত্মক বঞ্চনা সহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত আইন, নীতি ও চর্চাগুলির সমাপ্তি করুন।
  • রাখাইন রাজ্যে এবং ভবিষ্যত প্রত্যাবাসী রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠার জন্য মিয়ানমার ও বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সাথে অর্থপূর্ণ পরামর্শের অগ্রাধিকার দিন।
  • যে সমস্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা তাদের পূর্বের বাড়ি, জমি, সম্পত্তি বা অভ্যাসগত বাসস্থান থেকে নির্বিচারে বা অবৈধভাবে বঞ্চিত হয়েছে তাদের প্রত্যাবর্তনের অধিকারকে সম্মান করুন। এই জাতীয় সকল ব্যক্তির তাদের বাসভবন বা পছন্দের জায়গায় ফিরে যাওয়ার এবং তাদের সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার অধিকার রয়েছে। যারা নিজের বাড়িতে ফিরে আসতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক তাদের নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, সকল হারানো বাড়ি ঘর এবং সম্পত্তির বিপরীতে তারা সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ নেয়ার অধিকার পাবে শরণার্থীদের যারা নির্বিচারে বা বেআইনীভাবে তাদের স্বাধীনতা, জীবিকা, নাগরিকত্ব, পারিবারিক জীবন এবং পরিচয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে তাদেরও পুনর্বাসনের অধিকার রয়েছে।
  • নিরাপত্তা ও মর্যাদায় স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের পূর্ব শর্ত হিসাবে রাখাইন রাজ্যের সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রত্যাবর্তনকারীদের মানবাধিকার, জাতীয়তার পক্ষে সমান সুযোগের অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা এবং জীবিকা নির্বাহের অধিকার এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সম্পর্কিত সম্পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত করা।
  • ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিল করুন বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এটি সংশোধন করুন: নিশ্চিত করুন যে, আইনটি সহজাতভাবে বৈষম্যমূলক নয়, বিভিন্ন ধরণের নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য দূর করে এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্যে উদ্দেশ্যমূলক মানদণ্ড (objective criteria) ব্যবহার করে, যার মাধ্যমে পিতা মাতার মধ্যে যে কোনো একজন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হলে নাগরিকত্ব পাস হয়ে যায়।
  • জাতিসত্তা ও নাগরিকত্ব, এবং নাগরিকত্ব ও চলাচলের স্বাধীনতা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে সম্পর্ক পৃথকীকরণ করুন, যাতে নাগরিকত্বের অবস্থান বা জাতিগত সম্পর্ক নির্বিশেষে এই অধিকারগুলি অবিলম্বে কার্যকর করা যায়।
  • ইউএনএইচসিআর এবং অন্যান্য মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলির জন্য রাখাইন রাজ্যে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকারের অনুমতি দিন, মিয়ানমারের জন্য স্বাধীন তদন্তকারী ব্যবস্থা বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেশন মেকানিজম (আইআইএমএম), মানবাধিকার হাইকমিশনার অফিস, মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ দূত, মিডিয়া, কূটনীতিক এবং অধিকার পর্যবেক্ষকসহ যে কোনও প্রত্যাগমনকারীদের নিরাপত্তা নিরীক্ষণ করা।
  • রোহিঙ্গা, কামান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জন্য চলাচলের স্বাধীনতার উপর সকল স্বেচ্ছাচারী নিষেধাজ্ঞাগুলি তুলে নিন এবং তাদের চলাচল এবং জীবিকা নির্বাহকে সীমাবদ্ধ করে এমন সকল সরকারী ও বেসরকারী কার্যক্রম বন্ধ করুন।
  • রোহিঙ্গা ও কামান সম্প্রদায়সমূহ, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে কেন্দ্রীয় রাখাইন রাজ্যে বন্দি শিবির বন্ধের জন্য একটি হালনাগাদকৃত কৌশল এবং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করতে অর্থপূর্ণভাবে নিযুক্ত করুন যা স্পষ্ট সময়সীমা এবং পদ্ধতির সাথে চলাচলের স্বাধীনতা সহ দীর্ঘস্থায়ী সমাধানগুলি নিশ্চিত করে। রাখাইন, কচিন, শান, এবং চিন রাজ্যগুলিতে এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু অঞ্চলে সংঘটিত নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের বিশ্বাসযোগ্য, নিরপেক্ষ, এবং স্বাধীন তদন্তের সুবিধার্থে আইআইএমএম (IIMM) এবং জাতিসংঘের অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলিতে নিরবিচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকারের সুযোগ প্রদান ও সহযোগিতা করুন।
  • আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত [International Court of Justice-ICJ] কর্তৃক আদেশিত অস্থায়ী ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য বিশ্বাসযোগ্য এবং ব্যাপক প্রচেষ্টা গ্রহণ করুন।
     

জাতিসংঘের প্রতি

  • দ্বীপের সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং বসবাস যোগ্যতার একটি স্বাধীন প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন করার জন্য বর্ষা মৌসুমের আগেই ভাসান চরে অবিলম্বে প্রবেশাধিকারের প্রতি জোর দিন। একটি ফলো-আপ মূল্যায়ন পরিচালনার জন্যে বর্ষা মৌসুমে ভাসান চর পুনরায় পরিদর্শন করুন
  • পেশাদারদের নিয়ে দ্বীপে একটি সুরক্ষা মিশন পরিচালনা করুন যারা যৌন নিপীড়নের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যাক্তিদের সহায়তার জন্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। দ্বীপে পুলিশ এবং আটকাবস্থায় দেয়া সুবিধাগুলি পরিদর্শন সহ সুরক্ষা প্রয়োজনগুলি যাচাই করতে অঘোষিত স্থান পরিদর্শন চালিয়ে যান। দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করার পরে যারা আটক হয়েছেন তাদের সকলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিন।
  • শরণার্থীরা বর্তমানে ভাসান চরে যে সকল মানবিক ও সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ গুলির মুখোমুখি হচ্ছে সেগুলি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করুন এবং প্রতিকার চেয়ে থাকুন।
  • এসপিএইচইআরই মানদন্ডে [SPHERE Standards] উল্লেখ করা বিষয়বস্থুর সাথে  ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার মানদণ্ড পর্যবেক্ষণ করুন।
  • বাংলাদেশের শরণার্থীদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত রয়েছে তা নিশ্চিত করার জন্য সেক্রেটারি-জেনারেল-এর হিউম্যান রাইটস আপ ফ্রন্টের উদ্যোগ এবং মানবাধিকারের বিষয়ে তাঁর আহ্বানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জাতিসংঘ সদর দফতরে ও অঞ্চলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্থানান্তর সম্পর্কিত মানবাধিকার এবং মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দিন। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের নেতৃত্ব এবং জাতিসংঘের দেশীয় দল উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি অগ্রাধিকারের দৃষ্টিতে দেখা উচিত। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দ্বীপে আটক থাকা সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ৩০০ শরণার্থীর তাৎক্ষনিক প্রবেশাধিকার অনুসন্ধান করুন এবং তাদের নিরাপত্তা এবং মানবিক সহায়তার চাহিদার প্রতি সাড়া দিন।
  • ভাসান চরে সমুদ্র থেকে উদ্ধারকৃত ৩০০ জনেরও বেশি শরণার্থীসহ অনিচ্ছাকৃতভাবে ভাষান চরে আটকে থাকা শরণার্থীদের কক্সবাজারের ক্যাম্পে ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে চাপ প্রয়োগ করুন।
  • নিশ্চিত করুন যে, রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতা সহ সুরক্ষিত, সেচ্ছায় এবং অবহিতকরন প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যে কোনও প্রত্যাবাসন ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠা করা না হয়।
  • রাখাইন রাজ্যে ট্রানজিট এবং প্রত্যাবাসন ক্যাম্পগুলোতে পরিচালনার কাজ করবেন না যেটি মিয়ানমার ভবিষ্যতের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসীদের আটক রাখার আপাত অভিপ্রায় নিয়ে নির্মাণ করেছিল।
     

দাতা দেশগুলির প্রতি

  • ভাসান চরে যেকোন পরিকল্পিত মানবিক সহায়তা পরিচালনামূলক কার্যক্রমের বিষয়ে জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের সাথে তাৎক্ষনিক ভাবে জড়িত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিন।
  • কুতুপালং-বালুখালী ক্যাম্প গুলিতে শরণার্থীদের জন্য সাহায্য এবং নিরাপত্তার জন্য সমর্থন বৃদ্ধি করুন।
  • ভাসান চরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্থানান্তরিত করার ক্ষেত্রে বিরোধিতা করুন এবং ভাসান চরের নিরাপত্তা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং বসবাস যোগ্যতা সম্পর্কে স্বতন্ত্র মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই দ্বীপটিকে শরণার্থী স্থানান্তরের স্থান হিসাবে গড়ে তোলার জন্য নেয়া প্রকল্পগুলিকে অর্থায়ন করবেন না।
  • জোর দিয়ে বলুন যে প্রযুক্তিগত সুরক্ষা মূল্যায়নের সাপেক্ষে ভবিষ্যতের যে কোনও স্থান পরিবর্তন কেবলমাত্র অবহিতকরণ সম্মতিতে এবং যখন প্রশাসনের কাঠামো, সুযোগ-সুবিধাগুলি এবং সেবা সমূহ শরণার্থীদের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তখনই সংগঠিত হবে।
  • রোহিঙ্গা সঙ্কটের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গতভাবে শরণার্থীদের সহায়তা, সুরক্ষা এবং পুনর্বাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলি, কানাডা এবং অন্যান্য জড়িত দেশগুলির মধ্যে একটি বৃহত্তর দায়িত্ব-ভাগ করে নেওয়ার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করুন।
     

আসিয়ান (ASEAN) সদস্য এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলির প্রতি

  • রোহিঙ্গা শরণার্থীদের prima facie বা যে কোনো প্রমাণ দেখানো সাপেক্ষে  শরনার্থী স্বীকৃতি দেয়া, মর্যাদাপূর্ণ অস্থায়ী সুরক্ষা, বা ন্যায্য রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান পদ্ধতির সুবিধা প্রদান করুন এবং নিশ্চিত করুন যে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্যে আটকে না থাকে, সৌহার্দ বিহীন পরিস্থিতি বা মিয়ানমারে ফিরত পাঠানোর হুমকি না দেয়া হয়, যেখানে তারা নিপীড়ন ও নির্যাতনের ঝুঁকির  সম্মুখীন হয়।
  • রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিস্থিতিকে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করুন ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করুন যার জন্য একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেটি বাংলাদেশকে  সহায়তা প্রদান করবে এবং আঞ্চলিকভাবে ও অন্যান্য অঞ্চলে দায়িত্ব ভাগাভাগির মাধ্যম্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কার্যকর সুরক্ষার ব্যবস্থা করা।
  • এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে বসবাসরত পরিবারের সদস্যদের সাথে শরণার্থীদের, বিশেষত পরিবার পুনর্মিলনের লক্ষ্যে,  একটি আঞ্চলিক শরণার্থী পুনর্বাসনের পরিকল্পনা গ্রহণ করুন।
  • ভূমি বা সমুদ্রপথে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করা রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন বন্ধ করুন এবং তার পরিবর্তে তাদের ইউএনএইচসিআরের সাথে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে মানবিক সহায়তা এবং অস্থায়ী সুরক্ষা বা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য প্রক্রিয়াগুলিতে সম্পূর্ণ সুযোগ প্রাপ্তি নিশ্চিত করুন।
  • সঙ্কটাপন্ন শরণার্থী নৌকা গুলিকে জরুরি ভিত্তিতে, সমন্বিত অনুসন্ধান-ও-উদ্ধার কাজ এর মাধ্যম্যে নিকটতম নিরাপদ বন্দরে অবতরণের জন্য সহায়তা করুন।
  • রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিয়মতান্ত্রিক নির্যাতন বন্ধ  এবং নৃশংস অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি করার জন্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত শর্ত পূরণে সম্মিলিতভাবে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার জন্য এসোসিয়েশন অফ সাউথইস্ট এশিয়ান ন্যাশনস (আসিয়ান) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক প্রক্রিয়াগুলি ব্যবহার করুন।

 

Region / Country