Relatives cry for loved ones trapped in the collapsed Rana Plaza building outside Dhaka on April 24, 2013.

(c) 2013 Reuters

(নিউ ইয়র্ক) - হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আজ বলেছে যে বাংলাদেশে আটতলা ভবন ধসে যাওয়ার ঘটনা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাই তুলে ধরে। বর্তমান সরকার সৃষ্ট শ্রম-বিষয়ক পরিদর্শন ব্যবস্থায় ব্যাপক সংশোধন আনা দরকার। শ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠনে সরকারি বাধা বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজধানীর অদূরে সাভারে রানা প্লাজা ভবনে পাঁচটি তৈরিপোশাক কারখানা ছিল। ২০১৩র ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টায় ভবনটি ধসে পড়ে। এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় নিহতের সংখ্যা বেড়ে কয়েক শ’ দাঁড়ায়। তাদের অধিকাংশই ছিল তৈরিপোশাক শ্রমিক। অনেকেই তখনো ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে ছিল। এর আগের দিন ভবনের দেয়ালে বড় ফাটল দেখা দিলে তা খালি করা হয়। ধসের দিন সকালে অসংখ্য শ্রমিক ভবনে ঢুকতে দ্বিধা করছিল। কিন্তু কোম্পানির কর্মকর্তারা তাদের জানায় যে ভবন নিরাপদ। তাছাড়া তারা শ্রমিকদের হুমকিও দেয় বলে জানা যায়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের পরিচালক ব্র্যাড এডামস বলেন, “অতীতে কারখানায় বহু মৃত্যুর কথা মাথায় নিলে এই দুর্ঘটনাটি অনুমান করা সম্ভব।

“সরকার, স্থানীয় কারখানার মালিক ও আন্তর্জাতিক তৈরিপোশাক শিল্প শ্রমিকদের পৃথিবীর সবচেয়ে কম মজুরি দিয়ে থাকে। কিন্তু যেই শ্রমিকরা সারা পৃথিবীর মানুষের পিঠে কাপড়ের ব্যবস্থা করে তাদের জন্য তারা ভদ্রতার খাতিরেও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে রানা প্লাজা ভবন হচ্ছে কারখানা সম্পর্কিত দুর্ঘটনার তালিকায় সর্বশেষ ঘটনা। ২০০৫ সালের এপ্রিলে ৭৩ জন তৈরিপোশাক শ্রমিক সাভারে একটি ভবন ধসে মারা যায়। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একটি তৈরিপোশাক কারখানা ধসে পড়লে ১৮ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১০ সালের জুনে ঢাকার আরেকটি ভবন ধসে ২৫ জন শ্রমিক মারা যায়। ২০১২ সালের নভেম্বরে ঢাকার একটি কারখানায় আগুন লাগলে সেখানে ১০০ জনের বেশী শ্রমিক মারা যায়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিদর্শনের ব্যবস্থা খুবই নাজুক। মালিকপক্ষ বাংলাদেশের শ্রম আইনের বিধিবিধান মেনে চলছে কিনা তা দেখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রম মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন বিভাগের লোকবল কম সমসময়ই কম। ২০১২ সালের জুনে ঢাকায়, যেখানে রানা প্লাজা ছিল, ১০০,০০০ কারখানা পরিদর্শন করার জন্য পরিদর্শন বিভাগে মাত্র ১৮জন পরিদর্শক ও সহযোগী পরিদর্শক ছিল। তৈরিপোশাক শিল্প নিজেই প্রায় ৩ মিলিয়ন শ্রমিকের কর্মসংস্থান যোগায়।

শ্রম আইনের বিধান ভঙ্গের দায়ে শাস্তিস্বরূপ যে জরিমানা পরিদর্শকরা করে তা আইন মেনে চলার প্রবণতা সৃষ্টির জন্য একেবারেই অপ্রতুল। বর্তমান আইনে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিধান না মেনে চললে কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও, সাধারণত আইন ভঙ্গ হলে আনুমানিক ১৩ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়ে থাকে।

পরিদর্শন বিভাগের কর্মকর্তারা ২০১২ সালের জুনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানায় যে কারখানার ম্যানেজারদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে তারা অগ্রাধিকার দেয়। ফলে পরিদর্শনে গেলে তারা কারখানাকে আগের থেকেই তাদের আগমন সম্পর্কে জানিয়ে রাখত। একজন ডেপুটি চীফ ইন্সপেক্টর বলেন, “ম্যানেজমেন্টের সাথে আমরা সবসময় সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করি। পরিদর্শনের বেলায় আমরা আগের থেকেই তাদেরকে অগ্রিম নোটিশ দিয়ে রাখি। মাঝে মাঝে আমরা চিঠির মাধ্যমে তাদেরকে জানাই। অন্যান্য সময় ফোনেই জানিয়ে দেই।”

এডামস বলেন, “ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি সরকার মুখে মুখে শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা বললেও বাস্তবে নীতিনির্ধারকরা কারখানার মালিকদের কথাই বেশি শোনে।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে যে সরকারও তৈরিপোশাক শ্রমিকদের মৃত্যুতে অবদান রেখেছিল। কারণ তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল যাতে করে শ্রমিকরা অনিরাপদ কর্মক্ষেত্রে কাজ না করার ব্যাপারে তাদের মতামত ঠিক মত প্রকাশ না করতে পারে। ঢাকায় শ্রমিক সংগঠকরা জানিয়েছে রানা প্লাজার একটি কারখানাতেও ইউনিয়ন ছিল না। শ্রম আইন ঠিক মত প্রয়োগ হয় না বলে কারখানার মালিকরা প্রতিনিয়ত সংগঠিত হওয়া ও যৌথ ভাবে দর-কষাকষি করার অধিকার দাবি করা শ্রমিকদের ও স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন সদস্যদের হয়রানি ও ভয় দেখিয়ে থাকে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে যে বাংলাদেশ শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করে আসছে। ২০১২ সালের এপ্রিলে আমিনুল ইসলাম নামের এক শ্রমিক সংগঠককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার আগে তাকে বিধিবহির্ভুত ভাবে আটকে রাখা হয় যেখানে সরকারি নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে মারধোর করে। আমিনুল ইসলাম হত্যার কোন কূলকিনারা পাওয়া যায়নি। এই মুহূর্তে এক ডজনেরও বেশি শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সরকার এখনো বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি নামের একটি এনজিও’র বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে হয়রানি করছে। সেই এনজিও’র নিবন্ধনও বাতিল করেছে।

“রানা প্লাজার কারখানায় ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিকরা ভবনে প্রবেশ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারতো” - এডামস বলেন। “এই দুর্ঘটনার মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে ইউনিয়ন গঠনের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়াটি শুধুমাত্র ন্যায্য মজুরির বিষয় নয়। এর সাথে মানুষের জীবন বাঁচানোর সম্পর্ক আছে।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে যে পুরো সাপ্লাই-চেইনে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের কারখানা থেকে পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক ক্রেতা কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব আছে। রানা প্লাজার কারখানাগুলো বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিক্রেতা পোশাক সরবরাহ করছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই সকল কোম্পানির প্রতি আহবান জানিয়েছিল যে বাংলাদেশের তৈরিপোশাক কারখানাগুলো যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন মেনে চলছে তা যোগ্য-তৃতীয়-পক্ষ দিয়ে নিরীক্ষা করিয়ে এবং কারখানা পরিদর্শনের মাধ্যমে তা নিশ্চত করার।

“বিদেশী কোম্পানি ও ভোক্তারা বাংলাদেশের সস্তা শ্রম থেকে মুনাফা লাভ করে। কিন্তু সেই শ্রমিকদের মৌলিক ও মানবিক কর্মক্ষেত্রের জন্য তারা ঠিক মত দাবি করে না”, বলেন এডামস। “সময় এসেছে তাদের ঘোষণা দেয়ার যে যেই সব কারখানা ন্যুনতম মান বজায় রাখতে পারছে না তাদের কাছ থেকে পোশাক নেয়া হবে না। পৃথিবীর সবচাইতে বড় এই কোম্পানিগুলো আর মুনাফা ও অজ্ঞতার কথা বলে তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারবে না।”

২০১২ সালের অক্টোবরে “বিষাক্ত ট্যানারিঃ স্বাস্থ্যের উপর হাজারীবাগের চামড়ার খারাপ প্রভাব” শিরোনামে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১০১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে বলা হয় যে ট্যানারির নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা চাকরিক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছে। স্বাস্থ্যগত সমস্যার মধ্যে রয়েছে ট্যানারির বিভিন্ন কেমিকেলের কারণে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ ও ট্যানারি মেশিনে বিপদজনক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব। বাংলাদেশে ৯ সপ্তাহের গবেষণার উপর ভিত্তি করা এই প্রতিবেদনে হাজারীবাগের বস্তির বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়। বাসিন্দারা ট্যানারির কারণে অতিরিক্ত বায়ু, পানি ও মাটির দূষণ থেকে জ্বর, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টের সমস্যা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ করে।

বাংলাদেশের বহু কারখানার মালিক সংসদ সদস্য বা প্রধান রাজনৈতিক দলের সদস্য। ২০১১ সালে দেয়া সাক্ষাৎকারে সরকারের এক মন্ত্রী হিউম্যান রাইটস ওয়াকে বলেন যে যতদিন কারখানার মালিকরা রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে থাকবেন ততদিন শ্রমিকদের অধিকারের উন্নতি একেবারেই একটি “অসম্ভব” ব্যাপার।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এখন পর্যন্ত এমন কোন উদাহরণের কথা জানে না যেখানে বাংলাদেশ সরকার শ্রমিক মৃত্যুর দায়ে কোন কারখানা মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কারস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী সংসদে ১০% এর বেশি সদস্য তৈরিপোশাক কারখানায় মালিক।

এডামস জানতে চান, “কতগুলো কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ সরকার শক্তিশালী কোম্পানির মালিকদের সাথে তাদের সুসম্পর্কের ইতি টেনে শ্রমিকদের নিরাপত্তায় নজর ফেলবে?” যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার কর্মস্থলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় না আনবে এবং অনিরাপদ কর্মক্ষেত্র তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ব্যাপারে কঠিন না হবে, ততদিন শ্রমিকরা তাদের জীবন হারাতে থাকবে।”