১৫ বছর বয়সী বিলকিস, তার মায়ের বাড়ীতে তার এক বছর বয়সী ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল৷ তার ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল এবং স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে সে তার মায়ের বাড়িতে ফিরে আসে৷ সে ভয় পাচেছ যে, এই বছরের শেষে নদীর ভাঙনে তার পরিবারের বাড়িটি ভেসে চলে যাবে৷

© 2015 Omi for Human Rights Watch

(ঢাকা)-বাংলাদেশ সরকার বাল্য বিবাহ বন্ধে অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও এখনও পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়নি, আজ প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে এই কথা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ৷ ২০১৪ সালের জুলাইয়ে, ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্য বিবাহ পুরোপুুুরি বন্ধ করার কথা বলেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ কিন্তু তারপরই তিনি মেয়েদের বিয়ের নূ্যনতম বয়স ১৮ থেকে ১৬-তে নামিয়ে আনার ভুল পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা কি না এ ব্যাপারে তার অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর সংশয় জাগাচ্ছে৷
ইউনিসেফের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ১৫ বছরের কমবয়সী মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বাল্য বিবাহের হার সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ৷ বাংলাদেশে শতকরা ২৯ ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয় ১৫ বছরের কম বয়সে৷ এর মধ্যে শতকরা দুই ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১১ বছরের কম বয়সে৷ সরকারের ক্রমাগত নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের সহযোগিতার ফলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাল্য বিবাহ সম্পন্ন, এমনকি খুব অল্প বয়সে তা হচ্ছে৷ অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপক প্রবণতাও অনেক মেয়েকে এর ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে৷ এসব দুর্যোগ তাদের পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যা পরিবাগুলোকে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত
নিতে বাধ্য করছে৷
"বাল্য বিবাহ বাংলাদেশে এক মহামারী হয়ে উঠেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যা শুধু আরও খারাপের দিকে যায়"-বলেছেন নারী অধিকার বিষয়ক সিনিয়র গবেষক হিদার বার৷ তিনি আরও যোগ করেন-"বাংলাদেশ সরকার কিছু ঠিক কথা বলেছে, কিন্তু মেয়েদের বিয়ের বয়স কমিয়ে আনার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা ভুল বার্তা দিচ্ছে৷ সরকারের উচিত মেয়েদের আরও একটি প্রজন্ম হারিয়ে যাওয়ার আগেই সক্রিয় হওয়া৷"
"বিয়ে কর তোমার ঘর-বাড়ি ভেসে যাওয়ার আগেই : বাংলাদেশে বাল্য বিবাহ"-১৩৪ পাতার এই প্রতিবেদনটি দেশজুড়ে করা শতাধিক সাক্ষাত্‍কারের ভিত্তিতে তৈরি৷ এদের অধিকাংশই বিবাহিত নারী, কারো কারো বয়স মাত্র ১০৷ এটি মানুষকে বাল্য বিবাহের দিকে ঠেলে দেওয়ার কারণগুলো তুলে ধরেছে, যার মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিক্ষায় অধিকারের অভাব, সামাজিক চাপ, হয়রানি ও যৌতুক৷ বাল্য বিবাহ বাংলাদেশে একটি মেয়ে ও তার পরিবারের কী ধরনের ক্ষতি করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে৷ যেমন মাধ্যমিক পর্যায়েই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া, গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যা, আগাম গর্ভধারণের ফলে যা মৃতু্য পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে, স্বামী পরিত্যক্ত হওয়া এবং স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া৷
বাল্য বিবাহ বাংলাদেশে ১৯২৯ সাল থেকে অবৈধ৷ ১৯৮০ সালে বিয়ের নূ্যনতম বয়স মেয়েদের ১৮, ছেলেদের ২১ নির্ধারণ করা হয়েছে৷ তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়েদের বিয়ের হার বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ৷ এ ক্ষেত্রে নাইজার, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও চাদ-এর পরই বাংলাদেশের অবস্থান৷ বাংলাদেশে শতকরা ৬৫ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়সের আগেই৷
বিদ্যমান আইন প্রয়োগ ও বাল্য বিবাহের যেসব কারণ রয়েছে সেগুলো মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতায়, গরিব পরিবারগুলো নিম্নোক্ত সমস্যায় বাল্য বিবাহকেই উপযুক্ত সমাধান মনে
করে আসছে-
ঙ্ যেসব বাবা-মা ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাওয়াতে পারে না, তাদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে পাওে, না তারা মেয়ের জন্য একটা বর খুঁজে নিতে চাইতে পারে যাতে মেয়েটা অন্তত: খেতে পায়৷
ঙ্ শিক্ষা ুঅবৈতনিকচ্ হওয়া সত্ত্বেও অনেক গরিব মেয়ে স্কুলে যেতে পারে না, কারণ তাদের পরিবার পরীক্ষার ফী, স্কুল পোশাক, খাতা-কলমসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ জোগাতে পারে না৷
ঙ্ যেসব মেয়ে স্কুল ছেড়ে যায়, বাবা-মা প্রায়ই তাদের বিয়ে দিয়ে দেন৷
ঙ্ অবিবাহিত মেয়েদের যৌন হয়রানি এবং তা ঠেকাতে পুলিশের ব্যর্থতাও বাল্য বিবাহকে ত্বরান্বিত করে৷
ঙ্ সামাজিক চাপ ও রীতিনীতি, যৌতুক দেওয়ার ব্যাপক প্রচলন, যত কমবয়সী মেয়ে তত কম যৌতুক-এই ধারণা বাল্য বিবাহকে অনেক সম্প্রদায়ের কাছে শুধু গ্রহণযোগ্যই করে রাখে না, প্রত্যাশিতও করে তোলে৷

এই প্রতিবেদনে আরও যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হল বাল্য বিবাহে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভূমিকা৷ বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত ও জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ৷ এসব দুর্যোগ অনেক পরিবারকেই গভীর দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়, যা তাদের মেয়েদের শিশু বয়সে বিয়ের ঝুঁকি বাড়ায়৷ পরিবারগুলো জানিয়েছে-এসব দুর্যোগের পর অথবা তা আগাম অনুমান করেই তারা অল্পবয়সী মেয়েদের দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করার চাপ অনুভব করেন৷ বিশেষ করে নদীভাঙনে ক্রমাগত ধ্বংসযজ্ঞের ফলে যারা ঘর-বাড়ি, জমিজমা হারান তাদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়৷
বাংলাদেশ সরকার বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে৷ ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক "কন্যা-শিশু সম্মেলনে"- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাল্য বিবাহ বন্ধের অঙ্গীকার করেছিলেন৷ তিনি কতগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালের মধ্যেই আইনের সংস্কার ও একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন৷ এর কোনোটিই অর্জিত হয়নি৷ আরও বাজে ব্যাপার হচ্ছে-বাংলাদেশ সরকার উল্টো মেয়েদের বিয়ের নূ্যনতম বয়স ১৮ থেকে ১৬-তে নামিয়ে আনার ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে৷
স্থানীয় সরকারের অনেক কর্মকর্তার কারণেও বাল্য বিবাহের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েরা নিজেদের রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে৷ বাংলাদেশের আইনে যে ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়ের বিয়ে দেওয়া অবৈধ এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ছে৷ কিন্তু বাল্য বিবাহে ব্যাপক সহযোগিতা দিয়ে স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তারা এই সচেতনতাকে মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করছেন৷ সাক্ষাত্‍কারদাতারা বারবার জানিয়েছেন-স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তারা মাত্র ১০০ টাকা ঘুষের বিনিমেয়ে ভুয়া জন্ম সনদ দিয়ে মেয়েদের বয়স
১৮-এর বেশি দেখিয়েছেন৷ এমনকি স্থানীয় কর্মকর্তারা যদি বিয়ে ঠেকিয়েও দেন, যা তারা মাঝে মধ্যে করে থাকেন, পরিবারের সদস্যরা অন্য কাউকে দিয়ে সহজেই বিয়ের কাজটি
সেরে নিতে পারেন৷
"বাল্য বিবাহ বন্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসমক্ষে যে অঙ্গীকার করেছেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত তা নিয়ে দৃঢ়ভাবে এবং দ্রুত কাজ করা"-বলেছেন বার৷ "প্রথম পদক্ষেপই হওয়া উচিত অনতিবিলম্বে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬-তে নামিয়ে আনার প্রস্তাব থেকে পিছিয়ে আসা"-তিনি আরও যোগ করেন৷
অন্য অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়নের সফল উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়৷ এর মধ্যে রয়েছে নারীর অধিকারও৷ বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ১৯৯১-৯২ সালের তুলনায় ২০১০ সালে ৫৬.৭ শতাংশ থেকে ৩১.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার বিয়টি জাতিসংঘকে 'চমত্‍কৃত' করেছে৷ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ লৈঙ্গিক সমতা অর্জন করেছে৷ মাতৃমৃতু্য ২০০১ সালের তুলনায় ২০১০ সালে ৪০ ভাগ কমে এসেছে দেশটিতে৷ নানা বিষয়ে উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যে এ প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে যে-তাহলে এখানে কেন এখনও বাল্য বিবাহের হার উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে, যা কি না বিশ্বে অন্যতম নিকৃষ্ট৷
অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ ও শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে৷ এসব অধিকারের মধ্যে রয়েছে মানসম্মত স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বৈষম্যমুক্ত থাকার অধিকার, বিয়েতে স্বাধীন ও পূর্ণ মতামত দেওয়ার অধিকার, দাম্পত্য সঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনমুক্ত থাকার অধিকার৷ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দেখেছে, বাল্য বিবাহের ফলে এসব অধিকারের বাস্তবায়ন ও সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে৷
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গ্রাম পর্যায়ে গবেষণায় বাল্য বিবাহ সম্পর্কিত আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা প্রকল্পগুলোয় গলদ, যা বাল্য বিবাহের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের জন্য আরও অনেক কিছু করতে পারত-সে চিত্র তুলে ধরেছে৷ প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা অবৈতনিক করার মধ্য দিয়ে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে সরকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে৷ কিন্তু স্কুলে যাওয়ার আনুষঙ্গিক আরও অনেক খরচের কারণে শিক্ষা, বিশেষত: মাধ্যমিক শিক্ষা এখনও অনেক শিশুর সাধ্যের বাইওে রয়েছে৷ মেয়েদের বেলায় প্রায়ই এর পরিণতি হচ্ছে বাল্য বিবাহ৷ যেসব সরকারি সংস্থা দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিচ্ছে তাদের বাল্য বিবাহ বন্ধে আরও দক্ষ হতে হবে৷ প্রজনন স্বাস্থ্য ও জন্ম নিরোধক সামগ্রী কোথায় সরবরাহ করা হয় সে সম্পর্কিত তথ্য অনেক মেয়ের কাছেই নেই যাদের কি না এটি সবচেয়ে বেশি দরকার৷ সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার এমন মেয়েদের মধ্যে আমরা যাদের সাক্ষাত্‍কার নিয়েছি প্রায়ই দেখা গিয়েছে যে, তাদের সাহায্যের জন্য কোথাও যাওয়ার উপায় নেই৷ বাল্য বিবাহ সম্পর্কিত বাংলাদেশের আইনটির সংস্কার হওয়া প্রয়োজন, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে এটি পরিপূর্ণভাবে
কার্যকর করা প্রয়োজন৷
"অল্পবয়সী মেয়েরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ৷ বাল্য বিবাহ সম্পর্কে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা তাদের ভয়াবহ ক্ষতি করছে"-বলেন বার৷ তিনি আরও বলেন, "মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখা, বাল্য বিবাহের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের সহায়তা করা, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই, প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য ও জন্ম নিরোধক সামগ্রী পাওয়া -এসব ব্যাপারে সরকার ও তার দাতাগোষ্ঠীর আরও অনেক কিছু করা উচিত৷ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সরকারের উচিত বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে তার নিজের আইনটি প্রয়োগ করা৷"