(নিউ ইয়র্ক) - নিরাপত্তা বাহিনী এবং দলের সমর্থকরা আর সহিংসতায় না জড়ায় সেজন্য বাংলাদেশ সরকার এবং জামায়াতে ইসলামির দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আজকে জানিয়েছে যে ২৮ ফেব্রুয়ারির পর সহিংসতায় ৪০জন নিহত হয়েছে।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে সঙ্ঘটিত অপরাধ বিচার করার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহ-সভাপতি দেলোয়ার হোসেন সাঈদিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

ঢাকা ও অন্যান্য জায়গায় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালায়। গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী পুলিশের হাতেই বেশিরভাগ মৃত্যু ঘটলেও, আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মীরাও ভাংচুর ও সহিংসতায় অংশ নেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামি প্রতিবাদের ডাক দিলে জামায়াতের সদস্যদের হামলা পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ মাঠে নামে। জামায়াত তার সদস্যের প্রাণঘাতী সহিংসতায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। তবে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে যে জামায়াতের শিবির নামের গ্রুপটির সদস্যরা কিছু আক্রমণের জন্য দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘর ধ্বংস করার ঘটনা।

“জামায়াত নেতাদের অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও যুদ্ধাপরাধ বিচারের রায় সমর্থনকারীদের প্রতি তার দলের সদস্যদের সহিংস আচরণ বন্ধের প্রকাশ্য আহ্বান জানাতে হবে”, বলেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়ার ডাইরেক্টর ব্র্যাড এডামস। “একই সাথে সরকারের উচিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দেয়া তারা যেন সংযত আচরণ করে এবং নিজের ও অন্যের জীবন রক্ষার কারণ ছাড়া প্রাণঘাতী আঘাত না করে। সবাই মাথা ঠাণ্ডা রাখতে ব্যর্থ হলে ঢাকা শহরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা যাতে এমন কোন মন্তব্য বা আড়ম্বরপূর্ণ ভাষা না ব্যবহার করেন যা সহিংসতা বৃদ্ধি করবে বা পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। ১ মার্চ বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া সরকারের প্রতিক্রিয়াকে সমালোচনা করেন এবং সরকার ও পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের উপর শক্তি প্রয়োগ না করতে আহ্বান জানান। তিনি ১০ ফেব্রুয়ারি সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনাও করেন। মোল্লার রায়ের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল যাতে জনগণের আশার কথা মাথায় রেখে রায় ও শাস্তি প্রদান করে। জিয়া বলেন, তা না হলে বিচারকরা কোনভাবেই নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচারের ব্যবস্থা করতে পারবেন না। কিন্তু তারপর জিয়া অবিশ্বাস্য দাবি করে বসেন। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে র্ববর গণহত্যা চলছে ... এটা আমাদের কল্পনার বাইরে যে একটি সরকার তার নিজের দেশের মানুষের উপর গণহত্যা চালাতে পারে। গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ম্বাধীন করেছিলাম। একটি স্বাধীন দেশের সরকার গণহত্যা চালাবে তা মেনে নেয়া যায় না। ...” ৫ মার্চ জিয়া সারা দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেন।

এডামস বলেন, “সহিংসতা আমরা সমর্থন করি না। তবে গণহত্যার মত অদ্ভুত, অতিরঞ্জিত ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথাবার্তা শুধু প্রতিশোধমূলক সহিংসতাই সৃষ্টি করতে পারে। এমন কথা না বলাই উচিত।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে যে বেশিরভাগ মৃত্যু জামায়াতের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ঘটেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে ইউনাইটেড নেশনস বেসিক প্রিন্সিপালস অন্য দ্য ইউস অফ ফোর্স এন্ড ফায়ারআর্মস বাই ল এনফোর্সমেন্ট অফিশিয়ালসকে অনুসরণ করতে। সেখানে বলা আছে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী “আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আগে প্রাণঘাতী নয় এমন পন্থা ব্যবহার করতে হবে” এবং “যখন প্রাণঘাতী পন্থা ব্যবহার না করেই নয় তখন: ক) সংযত ও অপরাধের কথা মাথায় রেখে আনুপাতিক হারে ন্যায্য উদ্দেশ্য হাসিল করার লক্ষ্যে আইনসংগতভাবে বল প্রয়োগ করতে পারবে; খ) মানুষের জীবন রক্ষায় যতটুকু সম্ভব ক্ষতি এবং রক্তপাত এড়াতে হবে।” হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রতিবাদকালে সকল মৃত্যুর ব্যাপারে কার্যকর তদন্যের দাবি জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে সাঈদির মামলার রায়ের প্রতিবাদে জামায়াত ও শিবিরের সদস্যরা প্রাণঘাতী সহিংসতায় জড়িত ছিল। যেমন ১ মার্চ আওয়ামী লীগের সমর্থকরা জামায়াতের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালালে জামায়াতের সমর্থকরা সাজু মিয়া (৩০) ও নুরুন্নতা শাপুকে (২২) হত্যা করে। এড়া দুইজনই আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল। জামায়াত নেতারা এখন পর্যন্ত তাদের দলের সদস্যদের সহিংসতায় না জড়ানোর ব্যাপারে আহ্বান জানায়নি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিনটি রায় প্রদান করেছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দেয়া প্রথম রায়ে আবুল কালাম আজাদকে তার অনুপস্থিতিতে মানবতা বিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি দেয়া দ্বিতীয় রায়ে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে ৬টি অভিযোগের ৫টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে মানবতা বিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যাকাণ্ড-ও ছিল। একটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। কাদের মোল্লাকে যাবতজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি বলে সরকার সমর্থকরা ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে মোল্লার ফাঁসি দাবি করে ব্যাপক বিক্ষোভ করে। এই প্রতিবাদ “শাহবাগ আন্দোলন” নামে পরিচিতি পায় কারণ ঢাকার শাহবাগে প্রতিবাদকারীরা মোল্লার রায়ের পর প্রতিদিন জড়ো হতো। এই আবেগময় আন্দোলন মোটাদাগে শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে কিছু সহিংসতা ঘটে এবং জনা ১২ মারা যায়।

এই প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩ সংশোধন করে যার ফলে প্রসেকিউশন কাদের মোল্লার মামলায় হত্যার অভিযোগের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। ভূতাপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন্য সিভিল এন্ড পলিটিকাল রাইটস-এ সুরক্ষিত আন্তর্জাতিক আইনের ‘ডাবল জেপার্ডি’র বিধানকে লঙ্ঘন করে। এর ফলে এক ব্যক্তিকে একটি অভিযোগে আইন অনুযায়ী বেকসুর খালাস দেয়া হলে সেই অভিযোগের উপর ভিত্তি করে তাকে আর বিচার ও শাস্তি দেয়া যাবে না। এই আইনের সংশোধনের ফলে যুদ্ধাপরাধ সঙ্ঘটনের জন্য জামায়াতে ইসলামিকে দল হিসেবে বিচার করা যাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেছেন যে জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করা এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকে বন্ধ করে দেয়া উচিত।

২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন সাঈদির মামলার রায় প্রদান করে তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত ও মেরুকৃত ছিল। এ কারণেই সর্বশেষ সহিংসতাগুলো ঘটে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘদিন ধরে ১৯৭১ সালে সঙ্ঘটিত অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ন্যায়বিচার নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দাবি করে আসছে। কিন্তু এতদিন যে সকল মামলা সম্পন্ন হয়েছে তার সবগুলোই অসঙ্গতিপূর্ণ। অভিযুক্তের আইনজীবী সাক্ষীদের হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ এনেছেন। ২০১২ সালের নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের গেইট থেকে একজন সাক্ষীকে অপহরণ করা হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে দি একোনোমিস্ট এক সিনিয়র বিচারক ও এক বাইরের পরামর্শদাতার কথোপকথন প্রকাশ করে। এই কথোপকথনে বিচারক, প্রসেকিউটর ও সরকারের মধ্যে নিষিদ্ধ যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অভিযুক্তদের আইনজীবী প্রতিটি মামলার পুনর্বিচার দাবি করে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

মৃত্যুদণ্ড অপরিবর্তনীয়, অধঃপতিত এবং নিষ্ঠুর শাস্তি হওয়ার কারণে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কোনখানেই তা সমর্থন করে না।

“গত কয়েক সপ্তাহে এসব মামলায় মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে প্রতিবাদে প্রবল আবেগের ঢেউ দেখা গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত নেতাদের উচিত ছিল তার কর্মীদের এমন সহিংসতায় না জড়ানো যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে”, বলেন এডামস। “একই সাথে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে। ফলে মানুষ নিহত হয়, যা এড়ানো যেতো। এতে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।”