২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা শিশুরা একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক স্কুলে ক্লাশ করছে। মিয়ানমারে শিক্ষকতা করা রোহিঙ্গারা এই স্কুল পরিচালনা করে। অপ্রাতিষ্ঠানিক স্কুলগুলো রোহিঙ্গা শিশুদের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা লাভের একমাত্র উপায়। © ২০১৯ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

 

(ব্যাংকক, ডিসেম্বর ৩, ২০১৯)- বাংলাদেশ সরকার শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা বাচ্চাদের জন্য অর্থবহ শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার কাজে দাতাগোষ্ঠীগুলোকে বাধা প্রদান করছে এবং শিবিরের বাইরের স্কুলে শিশুদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করছে, আজ প্রকাশিত একটি রিপোর্টে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই কথা বলেছে। প্রায় ৪০০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের তাদের শিক্ষার অধিকার থেকে অবৈধভাবে বঞ্চিত করা এই নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে সরকারের প্রত্যাহার করা উচিত।

“‘আমরা কি মানুষ নই?: বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের শিক্ষার সুযোগ অস্বীকৃত’” (Are We Not Human? ’: Denial of Education for Rohingya Refugee Children in Bangladesh) শীর্ষক ৮১ পৃষ্ঠার রিপোর্টে বাংলাদেশ কীভাবে কক্সবাজার জেলার শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা শিশুদের স্বীকৃত বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করার কাজে দাতা গোষ্ঠীগুলোর বাধা সৃষ্টি করছে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে কোনো মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থা নেই, এবং বাংলা ভাষা শেখানো ও বাংলাদেশি পাঠ্যক্রম অনুসরণের ষেত্রে দাতাগোষ্ঠীগুলোকে বাধা প্রদান করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা শিশুদের শরণার্থী শিবিরের বাইরের বেসরকারী বা সরকারী বিদ্যালয়ে ভর্তি বা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই

“বাংলাদেশ স্পষ্টতঃই জানিয়ে দিয়েছে যে সে অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গাদের থাকতে দিতে চায় না, কিন্তু শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা তাদের ক্ষতিকে কেবল প্রকটই করে এবং শরণার্থীদের কোনো দুর্দশারই দ্রুত কোনো সমাধান প্রদান করে না।”, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের শিশু অধিকার বিষয়ক এসোসিয়েট ডিরেক্টর বিল ভ্যান এসভেল্ট এই কথা বলেছেন। “বাংলাদেশ সরকার তার সীমান্ত খুলে দিয়ে ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অগণিত প্রাণ রক্ষা করেছে, তবে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করার মতো বিভ্রান্ত নীতি থেকে বাংলাদেশকে সরে আসতে হবে।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১৬৩ জন রোহিঙ্গা শিশু, অভিভাবক, ও শিক্ষক, এবং সরকারি কর্মকর্তা ও মানবিক সহায়তা সংস্থা ও জাতিসংঘের এজেন্সিগুলোর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এছাড়াও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সরকারের নীতি ও ত্রাণ-সহায়তা পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখেছে এবং ত্রাণ-সহায়তা সংস্থাগুলো সরকারের বিধি-নিষেধের মধ্যে থেকে ত্রাণ শিবিরে কীভাবে শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রদান কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে সেটাও গবেষণা করে দেখেছে।

মিয়ানমারের পূর্ববতী নির্যাতনগুলোর মুখে পালিয়ে আসা কয়েক প্রজন্ম জাতিগত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় প্রদান করেছে, কিন্তু রোহিঙ্গা শিশুদের কখনোই আনুষ্ঠানিক ও স্বীকৃত শিক্ষাব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করেনি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ জাতিগত নিধন ও মানবতা বিরোধী অপরাধের মুখে পালিয়ে আসা প্রায় ৭৪০,০০০ অতিরিক্ত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দেয়, তবে পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার দাতাগোষ্ঠীগুলোকে শরণার্থী শিবিরে এমনকি অনানুষ্ঠানিকভাবেও বাংলাদেশী পাঠ্যক্রম অনুসরণ নিষিদ্ধ করে। বাংলাদেশ দাবি করছে যে রোহিঙ্গারা “দুই বছরের মধ্যে” মিয়ানমারে ফেরত যাবে।

ইউএনএইচসিআর, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক এজেন্সি, এবং জাতিসংঘের অন্যান্য এজেন্সি বারবার বলে আসছে যে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারের বর্তমান অবস্থা এখনো উপযোগী নয়। শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের জন্য বাংলাদেশ দুইটি অনুশীলনের আয়োজন করলেও কোনো শরণার্থী ফেরত যাবার বিষয়ে আগ্রহী নয়।

মিয়ানমারও শরণার্থী শিবিরে তাদের পাঠ্যক্রম ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়, ফলে ইউনিসেফ, জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা, একেবারেই শূণ্য থেকে একটি অনানুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম তৈরি করে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাবিষয়ক বাংলাদেশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা মেনে নিয়ে তৈরি করা এই অনানুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে সরকারের অনুমোদনের জন্য জমা দেয়া হয়, কিন্তু প্রাক-বিদ্যালয় ও প্রাথমিকের সমমানের শিক্ষার দুইটি “স্তর” অনুমোদনের জন্য ঢাকা এক বছর সময় নেয়। এই অনানুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের উচ্চতর তিনটি স্তর সরকার এখনো অনুমোদন করেনি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, কাঠামোগত শিক্ষার অভাব পূরণের ক্ষেত্রে এই অনানুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, কিন্তু রোহিঙ্গা শিশুদের বৈষম্যহীনভাবে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের বাধ্যবাধকতার দিক বিবেচনায় এই অনানুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম খুবই অপ্রতুল। এই পাঠ্যক্রম স্বীকৃত নয়, এমনকি রোহিঙ্গা শিশুরা মিয়ানমারে থাকাকালীন যেই শিক্ষা লাভ করেছে সেই শিক্ষাকেও এই অনানুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম স্বীকৃতি প্রদান করে না। সরকার এই অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পাঁচটি স্তরই অনুমোদন করলেও রোহিঙ্গা শিশুরা জাতীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বা মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা অস্বীকার করে চলেছে, আর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের চলাফেরার স্বাধীনতার সংকোচন রোহিঙ্গা শিশুদের সুনির্দিষ্টভাবে ২০১২ সাল থেকে স্কুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। শরণার্থীদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা মিয়ানমারের রয়েছে, আর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার প্রদান ও চরম নির্যাতনের অগণিত ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দায়িত্বও দেশটির রয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় বাধাপ্রদান অব্যাহত রাখা বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের জন্যই ক্ষতিকর এবং এটি সুনির্দিষ্টভাবে রোহিঙ্গা শিশুদের একটি নতুন প্রজন্মকে আর সামগ্রিকভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। শিক্ষা বঞ্চিত শিশুরা শিশু শ্রম, বাল্য বিবাহ, দারিদ্রের ফাঁদে পড়া ও তাদের নিজস্ব সমাজে পরিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণে ব্যর্থ হবার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শিক্ষিত শরণার্থী শিশুর অপরাধ বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হবার সম্ভাবনা কম এবং তারা তাদের আশ্রয়প্রদানকারী সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী, শরণার্থীদের তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিকল্পনা, প্রয়োগ ও পর্যবেক্ষণে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের, বিশেষ করে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শরণার্থী শিবিরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী সাবেক শিক্ষকদের সাথে দাতাগোষ্ঠীগুলোকে নিবিড়ভাবে কাজ করা উচিত। মিয়ানমারে যেসব শিশুরা স্কুলে গিয়েছিল তাদের শিক্ষা চলমান রাখার জন্য, বিশেষত মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা লাভের জন্য, এই স্কুলগুলো একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু যেহেতু স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুমোদনের অভাব রয়েছে তাই তারা কোনো আন্তর্জাতিক সহায়তা পায় না। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলছে শিবিরে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগের অভাব ইসলামিক ধর্মীয় বিদ্যালয়ের (মাদ্রাসা) বিস্তারে ভূমিকা পালন করছে, কিন্তু এই বিদ্যালয়গুলো সাধারণত কেবল প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করে।

মিয়ানমারের উচিত অবিলম্বে তার পাঠ্যক্রম শরণার্থী শিবিরে ব্যবহারের অনুমোদন ও এই বিষয়ে সহায়তা প্রদান করা, আর বাংলাদেশের উচিত দাতাগোষ্ঠীগুলোকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের আনুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমসহ মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের সুযোগ করে দেয়া।

শিশু অধিকার বিষয়ক সনদ ও অন্যান্য মানবাধিকার বিষয়ক সনদ অনুযায়ী সকল শিশুর শিক্ষা লাভের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা ছাড়া্ও ২০১৮ সালের বৈশ্বিক শরণার্থী চুক্তি (Global Refugee Compact), যা বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে, শরণার্থী শিশুদের জাতীয় পাঠ্যক্রমের আওতায় আনতে বলেছে। চুক্তিতে (Compact) অংশগ্রহণকারী বিদেশী সরকার ও জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ অঙ্গীকার করেছিল যে শরণার্থী শিশুরা স্থানান্তরিত হবার তিন মাসের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে, কিন্তু রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে বেআইনী বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর তারা প্রায় কোনো প্রকাশ্য চাপই প্রয়োগ করেনি।

আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলোকে স্বাগতিক সম্প্রদায়ের স্কুলগুলো পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা এবং কক্সবাজার জেলার শিশুদের শিক্ষার সুযোগকে সমর্থন করা, জেলাটিতে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ও স্কুল থেকে ঝরে পড়ার সংখ্যা বাংলাদেশের মধ্যে নিকৃষ্ট। দাতাগোষ্ঠীগুলোকে জেলাটিতে বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত উপকরণ নিশ্চিত করা উচিত এবং শরণার্থীসহ সকল শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করা উচিত।

বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ-সমন্বিত মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে বৈষম্যহীনভাবে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট মানদন্ড থাকা উচিত, এবং দাতা ও মানবিক সহায়তা গোষ্ঠীগুলোকে রোহিঙ্গা শিশুদের আনুষ্ঠানিক ও স্বীকৃত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। দাতা গোষ্ঠীগুলোর উচিত রোহিঙ্গা ও স্বাগতিক সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রদান করা। শিক্ষার সুযোগ প্রদানের জন্য ২০১৯ সালের প্রয়োজনীয় ৫৯.৫ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তার শতকরা ৬০ ভাগই অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত পূরণ হয়নি।

“রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুরা তাদের শিক্ষা ও উন্নততর ভবিষ্যতের সুযোগ কপূর্রের মতো উবে যেতে দেখছে, এবং দুই বছর পরেও তাদের স্কুল নেয়ার জন্য কোনো পরিকল্পনাই নেই,” ভ্যান এসভেল্ট বলেছেন। “শিশুদের একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা কারোরই স্বার্থ রক্ষা করে না, এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নীতি পরিবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোকে দাবী উত্থাপন ও এই বিষয়ে কাজ করে যেতে হবে।”