(নিউ ইয়র্ক) - ন্যায়বিচার লঙ্ঘন করা ভূতাপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই সংশোধনের মাধ্যমে আপিল বিভাগ আবদুল কাদের মোল্লাকে দেয়া যাবতজীবন কারাদণ্ডাদেশ পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে পেরেছে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় সঙ্ঘটিত অপরাধ বিচার করতে গিয়ে প্রদত্ত রায় ও শাস্তি প্রদানে সৃষ্ট বিতর্কের মাঝে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি শুধুমাত্র উপায় না থাকলেই বল প্রয়োগ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে আহ্বান জানায়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়ার ডাইরেক্টর ব্র্যাড এডামস বলেন, “১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে যেই সরকার আইনের শাসন মেনে চলার কথা বলে, সেই সরকার তার একটি রায় মন মত হয়নি বলে আইন পরিবর্তন করে তা ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করতে পারে না। সরকারের উচিত ঠাণ্ডা মাথায় ট্রাইব্যুনালকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা এমন সব প্রস্তাবিত সংশোধন বাতিল করা।”

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় সঙ্ঘটিত অপরাধ বিচার করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। যুদ্ধাপরাধ মামলায় বেশিরভাগ অভিযুক্তরাই বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। এই দল পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়াকে বিরোধিতা করেছিল। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার প্রথম রায় প্রদান করে। এই রায়ে আবুল কালাম আজাদকে তার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে এবং গণহত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়।

৫ ফেব্রুয়ারি দেয়া দ্বিতীয় রায়ে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধে হিসেবে হত্যা ছিল। কাদের মোল্লাকে যাবতজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। একটি হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি অভিযুক্ত হন।

সরকারি কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগের সদস্য এবং জনগণের একাংশ মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়। ঢাকার শাহবাগে মানুষ বড় জমায়েত করে। সেখানে তারা মোল্লার মৃত্যুদণ্ড দাবি তোলে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার আইনে সংশোধন আনার প্রস্তাব করে। সংশোধিত আইনে প্রসেকিউশন রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করতে পারবে। তাছাড়া আপীল সম্পন্ন করার সময়ও কমিয়ে আনা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি সংশোধনের খসড়া বিল সংসদে পেশ করা হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি এই বিল পাস হওয়ার কথা। এই রায়ের আগ পর্যন্ত প্রসিকিউশন শুধুমাত্র অভিযুক্ত ব্যক্তি বেকসুর খালাস হলে তার বিরুদ্ধে আপীল করতে পারতো এবং আপীল সম্পন্ন করার জন্য ৯০ দিন ধার্য ছিল। এই সংশোধন ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন্য সিভিল এন্ড পলিটিকাল রাইটস’কে (আইসিসিপিআর) লঙ্ঘন করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই কভেন্যান্টকে অনুমোদন করেছে। আইসিসিপিআর এর ১৪তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “কোনো ব্যক্তিকে একটি অভিযোগে আইন অনুযায়ী বিচার করে শাস্তি দেয়া হলে বা বেকসুর খালাস করে দেয়া হলে সেই অভিযোগের উপর ভিত্তি করে তাকে আর বিচার ও শাস্তি দেয়া যাবে না।”

গণমাধ্যমে বলা হয় যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচারকদের সাথে কথা বলবেন যাতে তারা জনগণের মনোভাব মাথায় রেখে তাদের সিদ্ধান্তে পৌঁছান। আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন যে আইন সংশোধন করে সরকার পক্ষ ও অভিযুক্তের মধ্যে সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিলটি যখন সংসদে প্রথম পেশ করা হয় তখন সংসদের ডেপুটি স্পিকার বলেন, “এটাই সংসদের ভাষা।”

প্রতিবাদকারীরা জামায়াত এবং তার ছাত্র সংগঠন শিবিরকে নিষিদ্ধের দাবি জানায়। তাছাড়া তারা বলেছেন আইনকে আরো সংশোধন করতে যাতে রাষ্ট্রপতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা না করতে পারেন। জামায়াতের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে বন্ধ করার দাবিও ওঠে।

সরকার সমর্থিত প্রতিবাদ, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য সরকারি ও আওয়ামী লীগ সদস্যদের মন্তব্য চলতি ও ভবিষ্যতের মামলার নিরপেক্ষতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে। নির্ভরযোগ্য সূত্র হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছে যে অভিযুক্তদের পক্ষের কিছু সাক্ষী প্রতিশোধের ভয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে আসতে চাচ্ছে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ যে বিচারকরা মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্যও কোন রায় দিতে ভয় পেতে পারেন।

“সেপারেশন অফ পাওয়ারস এবং আইনের শাসনের মানেই হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের রায় মেনে নেয়া। এমনটা জনগণকে না বুঝিয়ে সরকার বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছে”, বলেন এডামস। “১৯৭১ সালে অপরাধ সঙ্ঘটনের সাথে জড়িতদের বিচার করা দেশের জন্য খুব জরুরি কিন্তু তা করতে গিয়ে যাতে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস না করা হয়।”

প্রতিবাদ শুরু শান্তিপূর্ণ হলেও, শেষের দিনগুলোয় সহিংসতা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছে যে তাদের ছাত্র সংগঠন শিবিরের সদস্যরা হাতেতৈরি বোমা পুলিশের দিকে ছুড়লে পুলিশ তাদের আক্রমণ করে। বিভিন্ন অপরিচিত মানুষের তোলা ছবি থেকে জানা যায় যে পুলিশ ও প্রতিবাদকারীরা সহিংসতায় জড়িত ছিল। অন্তত একটি ছবিতে দেখা গিয়েছে যে দাঙ্গার জন্য প্রস্তুত পুলিশের পাশে সাদা পোশাকে কিছু ব্যক্তি দাঁড়ানো, যারা প্রতিবাদকারীদের উপর গুলি চালাচ্ছে।

জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়া দিগন্ত পত্রিকা অফিসে অগ্নিসংযোগের  বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে আছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তত ৩০ জন মানুষ আহত হয়। এদের মধ্যে প্রথম আলোর সম্পাদকও ছিলেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানানো হয় যে তার বুকে রাবার বুলেট লাগে।। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের সমালোচনা করা আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও অফিসে হুমকি দেয়া হয়েছে।

ইউনাইটেড নেশনস বেসিক প্রিন্সিপালস অন্য দি ইউস অফ ফোর্স এন্ড ফায়ারআর্মস বাই ল এনফোর্সমেন্ট অফিশিয়ালস-এ বলা আছে যে “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আগে প্রাণঘাতী নয় এমন পন্থা ব্যবহার করতে হবে। নিজের ও অন্যের উপর শুধুমাত্র মৃত্যু বা বড় জখমের নিশ্চিত হুমকি থাকলে আত্মরক্ষায় বা অন্যকে রক্ষায় প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ করা যাবে।”

“বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সাথে প্রবল আবেগ ও রাজনীতি জড়িত। দুই পক্ষের প্রতিবাদকারীরাই মনে করে যে সর্বশেষ রায়ে তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে”, বলেন এডামস। “সরকারের উচিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি পরিষ্কার নির্দেশনা দেয়া তারা যাতে সংযত আচরণ করে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।”