ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের নির্যাতনে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদের মৃত্যুর অভিযোগে ৯ অক্টোবর ২০১৯ ছাত্ররা বিক্ষোভ করে।

© ২০১৯ মেহেদী হাসান/নূরফটো গেটি ইমেজের মাধ্যমে

(নিউ ইয়র্ক)- জালিয়াতির অভিযোগ ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয় লাভ করে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার বিরোধী মতের কন্ঠরোধ করে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্যাতনের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বৈশ্বিক রিপোর্ট ২০২০-এ এই কথা বলেছে।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তার চর্চা নিয়ে নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতি সংঘের কমিটির পর্যালোচনায় অংশগ্রহন করে। কিন্তু কমিটি যখন জোরপূর্বক অন্তর্ধান ও নির্যাতনের বিষয়ে বাংলাদেশকে চাপ প্রয়োগ করল- যেগুলো নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে প্রতিবেদন করছে- সরকার তখন সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করল। এদিকে ক্রসফায়ারের সময় এই শত শত মৃত্যুগুলোর ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেআইনী হত্যাকান্ডের মতো ভয়াবহ নির্যাতন দায়মুক্তি নিয়েছে। ২০১৯ সালে মাইকেল চাকমাসহ, একজন আদিবাসী অধিকারকর্মী, কমপক্ষে ২৪ জন জোরপূর্বক অন্তর্ধান হয়েছে।

“কর্তৃত্ববাদীতার দিকে ক্রমবর্ধমানভাবে ঝুঁকে যাওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের উদ্বেগের মধ্যেই বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংসদে ৯৬ শতাংশ আসন লাভের মাধ্যমে সরকার গঠন করে,” হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ব্রাড এডামস এই কথা বলেছেন। “মানবাধিকারের প্রতি সরকারের সম্মানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক ও জনমানুষের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ গ্রহণের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন দল সুশীল সমাজের ওপর কঠোর হয়েছে।”

৬৫২ পৃষ্ঠার বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০২০ এর ৩০তম সংস্করণে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রায় ১০০টি দেশের মানবাধিকার চর্চা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ তাঁর প্রারম্ভিক প্রবন্ধে বলেছেন, দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকা চীন সরকার বিগত কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্ব মানবাধিকার ব্যবস্থায় সবচেয়ে তীব্র আঘাত হানছে। তাঁর মতে বেইজিংয়ের কার্যক্রম সারা বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক ও লোকরঞ্জনবাদী সরকারগুলোর কেবল সমর্থনই লাভ করছে না, বরং তাদের উৎসাহিতও করছে। আর চীনা কর্তৃপক্ষ অন্যান্য দেশের সরকারের সমালোচনা রোধ করার জন্য নিজের অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে যা মানবাধিকারের বিগত কয়েক দশকের অগ্রগতি আর আমাদের ভবিষ্যতকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়া এই আক্রমণকে প্রতিহত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

গ্রেফতার, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের সহিংস হামলা বা কর্তৃপক্ষের হুমকির ভয়ে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং অন্যান্য সমালোচকরা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ (self-censor) চর্চা করেছে আর সরকার অনলাইনে প্রকাশিত মতামতকে নিয়ন্ত্রণ (censor) করেছে।

মার্চ মাসে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘটের পরে কমপক্ষে ৭,৫০০ পোশাক শ্রমিককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে শ্রমিক নির্যাতনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।

যৌন নিপীড়ন বিষয়ক বাংলাদেশী আইন ও চর্চাগুলোর সংস্কার ও সেগুলো যথাযথ প্রয়োগের দাবিতে এপ্রিল মাসে দেশব্যাপী বিক্ষোভ হয়। মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ দায়েরের পর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির (১৯) মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভ আরম্ভ হয়।

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আগত প্রায় দশ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদানকারী দেশ বাংলাদেশ। গুরুতর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত থাকা চাপ সত্ত্বেও শরণার্থীদের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন না করানোর আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ রক্ষা করেছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের নীতি ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়নের ফলে শরণার্থী শিবিরের অবস্থার অবনতি হয়েছে।

সেপ্টেম্বর মাসে সরকার শরণার্থীদের ইন্টারনেট সেবা ও অনলাইন যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত করে দেয় এবং নভেম্বরে শরণার্থী শিবিরের চতুর্দিকে কাঁটাতারে বেড়া দেয়া শুরু করে। পলি মাটি জমে সৃষ্টি হওয়া ভাসানচরের বসবাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বারংবার শরণার্থীদের চরটিতে স্থানান্তরের হুমকি দিয়েছে।

মার্চে বাংলাদেশ মিয়ানমারের জাতিগত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের প্রাথমিক অনুসন্ধানের অংশ হিসাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রথম মিশনকে স্বাগত জানায় আর নভেম্বরে আদালত তদন্ত শুরুর অনুমতি প্রদান করে।