(নিউ ইয়র্ক, মে ১০, ২০১৮)- বাংলাদেশে বিগত ৫ বছরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি আইন) ৫৭ ধারায় অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফেসবুক, ব্লগ, অনলাইন পত্রিকা এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার, রাজনৈতিক নেতা এবং অন্যান্যদের সমালোচনা করার জন্য তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত একটি নতুন প্রতিবেদনে আজ এ কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল, যেটি বর্তমান আইসিটি আইনের সংশোধিত ও পরিমার্জিত আইন বলে সরকাল দাবি করছে, কিছু ক্ষেত্রে তা বিদ্যমান আইনের চেয়েও ভয়াবহ। আইনটি চালু হলে বাক স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার যে নীতিমালা রয়েছে বাংলাদেশ তার লঙ্ঘন ঘটাবে।

আগামী ১৪ মে, ২০১৮ জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। এটি ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) বলে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার অংশ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর মতে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকার ভিন্নমতাবলম্বী, সমালোচক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর নিপীড়ন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। উপরন্তু সরকার এই ফোরামে বাক স্বাধীনতার পক্ষে ব্যাপক গণসংযোগের অঙ্গীকার করতে পারে। এই গণসংযোগের অংশ হিসেবে, ভিন্ন ধর্ম ও মতাবলম্বীদের বাক স্বাধীনতা রুখতে তাঁদের উপর যেসব জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো হামলা চাল্লাচ্ছে সেসব জঙ্গিগোষ্ঠীদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া পরিচালক ব্রাড এডামস বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার স্বীকার করে যে বিদ্যমান আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা নিপীড়নমূলক এবং এটি বাতিল হওয়া দরকার। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন আইনটিকে বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে দেখা মুশকিল। কারণ নতুন আইনটি অনেকগুলো নতুন অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করেছে, নিশ্চিতভাবে যেগুলো ভবিষ্যতে দেশটির অতিমাত্রায় রাজনৈতিকীকৃত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে।’

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের বোঝা দরকার যে সমালোচনা, সেটা যতই অপছন্দনীয় বা বেদনাদায়কই হোক না কেন, এটি জনজীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ। এবং এটি ভুল সংশোধন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করে। মতপ্রকাশ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতার নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নতুন আইনের খসড়া তৈরির জন্য দেশী ও বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে সরকারের কাজ করা দরকার।

Brad Adams

Asia Director

89 পৃষ্ঠার রিপোর্ট No Place for Criticism: Bangladesh Crackdown on Social Media Commentary” ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ২০১৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে- কঠোরতর শাস্তির বিধান ও পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রদান করার পর যথেচ্ছ গ্রেপ্তারের ডজনখানেক ঘটনা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় দায়েরকৃত ১২৭১টি মামলায় ঢাকার সাইবার ট্রাইবুনালে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। মামলা চালানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ এই মামলাগুলোতে পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশ অভিযোগপত্রে দাবী করেছে।

এই মামলাগুলোতে অনেকেই একাধারে কয়েকমাস জেলে থাকার পর মামলা চলমান অবস্থায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে রাজনৈতিক সমালোচনামূলক পোস্ট অথবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, তাঁর আত্মীয় এবং সহকর্মীদের ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশের জন্য মামলা করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা অথবা মানহানির জন্যও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

যেকোনো মিথ্যা এবং অশ্লীল, মানহানিকর, শ্রোতা বা পাঠককে ‘নীতিভ্রষ্ট বা বিপথগামী করতে পারে এমন’, ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ ঘটায় বা ঘটাতে পারে, কোনো ব্যক্তির বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে, অথবা ‘ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করে বা করতে পারে’ এমন যেকোনো কিছু ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি প্রকাশ বা প্রচার করলে তার বিচারের ক্ষমতা আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা ও বিচারের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমতি নেয়ার বিধান, মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় অভিযুক্তের জামিনের বিধান বাতিল এবং দন্ডিতের জন্য কারাদন্ডের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আইসিটি আইনের অধীন দায়েরকৃত মামলার বিচারের জন্য পৃথক সাইবার ট্রাইবুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এগুলোর ফলে পুলিশের কাছে দায়েরকৃত অভিযোগ, গ্রেপ্তার ও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর পোষাক, তাঁর পররাষ্ট্র নীতি, দল বা তাঁর মন্ত্রীপরিষদের সদস্যদের সমালোচনা করার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকরা গ্রেপ্তার হয়েছে। পুলিশ তাঁর দলের সমর্থকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এবং কখনো কখনো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, ২০১৮ সালের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের বিক্ষোভের পর একজন পুলিশ অফিসার ৪৩টি ‘উস্কানিমূলক’ ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এই পোস্টগুলোতে ‘এমনসব লাইক ও কমেন্ট’ করা হয়েছে যা ‘সমাজের ক্ষতি এবং বিশৃঙ্খলার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে’ বলে অভিযোগ করা হয়। অভিযোগটিতে ৫৭ ধারার অধীনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

এপ্রিল ২০১৭-তে একটি ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সমালোচনা করা হয়। এই পোস্টে ‘লাইক’ দেয়ার জন্য তাঁর দলের একজন সমর্থক শ্রীমঙ্গলের রাবার বাগানের শ্রমিক মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই সমর্থক তার ‘অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে এবং তিনি সংক্ষুব্ধ’ বলে অভিযোগ করলে পুলিশ মনিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও ৫৭ ধারার কারণে হুমকির মুখে রয়েছে। দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগ বা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির সমালোচনা করে অনলাইনে নিবন্ধ লেখার জন্য অনেক সাংবাদিক ও সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০১৭ সালের জুনে সরকারদলীয় একজন সাংসদ আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন না বলে ধারণা করে লেখা একটি নিবন্ধ হবিগঞ্জ সমাচার-এর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশের জন্য পুলিশ পত্রিকাটির সম্পাদক গোলাম মোস্তফা রফিককে গ্রেপ্তার করে।

জুলাই ২০১৭-তে ত্রাণের ছাগলের মৃত্যুর ঘটনার একটি প্রতিবেদন ফেসবুকে ‘শেয়ার’ করেন আবদুল লতিফ মোড়ল এবং এই অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনেক সাংবাদিক তার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবেদনটি ‘মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার’ জন্য ‘শেয়ার’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

দন্ড ও খালাসের সংখ্যা নিয়ে সাইবার ট্রাইবুনাল অনুাষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ না করলেও পারিপার্শ্বিক বিবেচনায় এখন পর্যন্ত কিছু ব্যক্তি দন্ডিত হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে শেষ পর্যন্ত কেউ দন্ডিত হলো কিনা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কেবলমাত্র অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার ও আটকই, বক্তব্য ও ভিন্নমত প্রকাশের জন্য প্রতিকূল ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

৫৭ ধারার অপব্যবহারের কথা স্বীকার করে সরকার আইনটিকে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন আইনে মতপ্রকাশের জন্য গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে কিছু রক্ষাকবচ রয়েছে বলে সরকার দাবি করছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, সংসদে বিবেচানাধীন আইনটি বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট বাধা সৃষ্টি করবে।

প্রস্তাবিত নতুন আইনটির কিছু বিধান বিদ্যমান আইনের ৫৭ ধারার চেয়েও ভয়াবহ। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা প্রস্তাবিত আইনটির কিছু বিধান নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা মনে করছেন এগুলো দুর্নীতি ও অপরাধ উন্মোচনের উদ্দেশ্যে গোপন রেকর্ডিংকে গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে পরিগণিত করবে। সাংবাদিকরা আরো মনে করেন যে এই আইনটির ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ধুলিসাৎ হতে পারে। খসড়া আইনটিতে ‘আক্রমণাত্মক বা ভীতিকর’ তথ্য প্রকাশের মতো অস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত অপরাধের জন্য কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি ‘সামাজিক সম্প্রীতি বিনাশ অথবা অস্থিতিশীল বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা অথবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো বা ঘটাতে পারে এমন’ তথ্য প্রকাশের জন্য ১০ বছরের কারাদন্ড প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়া আইনটির ভাষ্য খুবই ব্যাপক যা অধিকতর অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

খসড়া আইনটিতে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির জনকের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার ও প্রচারণার’ জন্য আজীবন কারাদন্ড প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি, একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী যারা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আর্ন্তজাতিক আইন (International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR))-এর বিধান পরিপালন পর্যবেক্ষণ করে তারা বাংলাদেশর এই আইনটি নিয়ে বলেছেন, ঐতিহাসিক তথ্যের ব্যাপারে মতপ্রকাশকে কোনো দেশের আইন অপরাধ হিসেবে গণ্য করলে তা দেশটির মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আর্ন্তজাতিক নীতিমালার পরিপন্থী হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ৫৭ ধারা প্রতিস্থাপন করে কোনো নতুন আইন প্রণয়ন করা হলে আইনটি যেন আন্তর্জাতিক আইনে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে রক্ষা ও এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় তা নিশ্চিত করার জন্য দেশটির সুশীল সমাজের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন। বাক স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত কেবলমাত্র সেসব ক্ষেত্রেই করা যেতে পারে যেগুলো নিতান্তই নিকৃষ্টতম, যেমন- কোনো সংঘাতে সরাসরি প্ররোচনা প্রদান করা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সমালোচনা বা মানহানিকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা কাম্য নয়।

এডামস বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের বোঝা দরকার যে সমালোচনা, সেটা যতই অপছন্দনীয় বা বেদনাদায়কই হোক না কেন, এটি জনজীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ। এবং এটি ভুল সংশোধন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করে। মতপ্রকাশ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতার নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নতুন আইনের খসড়া তৈরির জন্য দেশী ও বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে সরকারের কাজ করা দরকার।’