২০১৫ সালে বাংলাদেশ একটি স্বেচ্ছাচারিতা পূর্ণ গতিপথে পরিচালিত হতে থাকে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচন বয়কট করার পর থেকে বাংলাদেশের কোনও সক্রিয় সংসদীয় বিরোধীদল ছিল না। সংসদীয় বিতর্কের বদলে, ২০১৫ সালে বিএনপিকে রাজপথে নামতে দেখা যায় এবং আওয়ামীলীগ নেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে অবতীর্ণ হতে দেখা যায় বাক স্বাধীনতা হরণ এবং সুশীল সমাজকে ছত্রভঙ্গ করার ভূমিকায়।

বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে, রাজপথের বিক্ষোভ সহিংস রূপ ধারণ করলে রাজপথে সাধারণ যাত্রীদের অনেকেই আহত হন ও প্রাণ হারান। ঘন ঘন অবরোধ ও হরতালের কারণে শিশুদের স্কুলে যাওয়া এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়।

রাজপথের সহিংসতা দমনের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, বিরোধী দলের হাজার হাজার সদস্যদের বন্দী এবং বিরোধীদলের পরিকল্পিত বিক্ষোভের পূর্বে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে নজরবন্দী করে রাখার মাধ্যমে সরকার এর জবাব দেয় । বিরোধী দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদেরকে বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে কিছু অভিযোগ ছিলো সাজানো। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অনেকেই গা ঢাকা দেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক হত্যা, গুম এবং নির্বিচারে আটকের মত বেশ কয়েকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়; যার মধ্যে মাত্র কয়েকটিতে দোষীদের তদন্ত বা বিচারের আওতায় আনা হয়।     

বাক-স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সরকারের সমালোচনাকারী গণমাধ্যম সমূহকে বন্ধ করে দেয়া হয়, এবং এদের সম্পাদকদের বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। নাস্তিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল চারজন ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। উক্ত আক্রমণ সমূহের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার বদলে, সরকার বাক-স্বাধীনতা চর্চায় নিয়ন্ত্রণ আনতে ব্লগারদের প্রতি আহ্বান জানায়। সরকারের সমালোচনা করার দায়ে সুশীল সমাজের কর্মী এবং সাংবাদিকগণ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার শিকার হন এবং অন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনার জন্য আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হন।

২০১৩ সালের রানাপ্লাজা ভবন ধ্বসে হাজারেরও বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু এবং আহত হওয়ার ঘটনার পর, পোশাক কারখানার নিরাপত্তা বিধানে বাংলাদেশ বেশ অগ্রগতি সাধন করে। ২০১৫ সালে শ্রম আইনে কিছু উন্নয়নমূলক সংশোধন আনা হয়, যেখানে ইউনিয়ন গঠন বিষয়ক স্বেচ্ছাচারী আইনি জটিলতা দূর করা হয়। তবে, ইউনিয়ন গঠনকে বাধাগ্রস্ত করতে কিছু কিছু কারখানার মালিকরা হুমকি এবং সহিংসতা প্রয়োগ করেন।

নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন এবং বিচারহীনতা

মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আপোষহীন ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামীলীগ সরকার দায়িত্বগ্রহণ করলেও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে এবং কোন কোন স্থানে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিচার বহির্ভূত আটক, নির্যাতন, গুম এবং হত্যা সহ বেশ কিছু মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটনের জন্য দায়ী ছিল পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)  এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‍্যাব)।

২০১৫ সালের ১০ মার্চ বিরোধীদল বিএনপি'র মুখপাত্র সালাউদ্দিন আহমেদ তাঁর একজন বন্ধুর বাসভবনে আত্মগোপনকালে অপহৃত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অপহরণকারীরা নিজেদেরকে গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে উক্ত এলাকায় র‍্যাব এর গাড়ি উপস্থিত ছিল। মে মাসে সালাউদ্দিন আহমেদকে ভারতে খুঁজে পাওয়া যায় এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এর নিকট এই মর্মে আশ্রয় প্রার্থনা করেন যে, তিনি কয়েকজন অজ্ঞাত বন্দুকধারী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন এবং তিনি আশঙ্কা করছেন যে বাংলাদেশে ফিরে গেলে তাঁর  জীবনহানী ঘটবে। এই ঘটনায় এবং অন্যান্য গুমের ঘটনায় সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে তদন্ত পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি যেসকল ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা দুষ্কৃতিকারীদেরকে র‍্যাব অথবা পুলিশ বাহিনীর সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেসকল ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করা হয় নি।

বিরোধীদল জামায়াত-ই-ইসলামি দাবি করে যে, পুলিশ এবং গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা তাদের কর্মীদের উপর গ্রেপ্তার ও নির্যাতন চালিয়েছে।  তারা আরও জানায় যে, তাদের বেশ কিছু সদস্য নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নিহত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ৩১ জানুয়ারি প্রত্যক্ষদর্শীরা আহমাদুল্লাহ নামক দলের একজন ২২ বছর বয়সী ছাত্র সমর্থককে পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হতে দেখেন; পরদিন সকালে তার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ দাবি করে তিনি নিরাপত্তা বাহিনী এবং জামায়াত সমর্থকদের মধ্যেকার ক্রসফায়ারে নিহত হন।  

বেশ কয়েকজন জামায়াত সমর্থক বলেন যে, পুলিশ তাদেরকে হেফাজতে নিয়ে যায় এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে বিকলাঙ্গ করার উদ্দেশ্যে তাদের হাঁটু এবং জঙ্ঘাস্থিতে গুলি করে। ‘অধিকার’ নামক বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংস্থা অন্তত পক্ষে এরূপ ৩০টি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে যেখানে গ্রেপ্তারের কিছু সময় পরে গ্রেপ্তারকৃতদের পায়ে গুলি করা হয়। পুলিশ দাবি করে যে,  সহিংস জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার প্রচেষ্টায় গুলি বর্ষণের ঘটনা সমূহ ঘটে।    

আইন ও সালিশ কেন্দ্র নামক বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০১৫ এর মধ্যবর্তী সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নিহত ১৩৫ জনের মধ্যে ৯০ জন পুলিশ কর্তৃক, ৩৩ জন র‍্যাব কর্তৃক এবং বাকিরা বিজিবি সহ অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য কর্তৃক নিহত হন।

আগস্ট মাসে র‍্যাবকে ক্ষমতাসীন দলের তিনজন সদস্যকে হত্যার জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যা সরকার সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

সুশীল সমাজের ওপর আক্রমণ

২০১৫ সালে সরকার নাগরিক সংগঠন ও সরকারের সমালোচকদের উপর আরো অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশী সংস্থা সমূহের বৈদেশিক তহবিলের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে একটি নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার” কে প্রতিনিয়ত হয়রানীর শিকার হতে হয় এবং এর বৈদেশিক তহবিল প্রাপ্তি আটকে দেয়া হয়। আগস্ট মাসে “অধিকার” বিচার বহির্ভূত হত্যার বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যার প্রেক্ষিতে পুলিশ একটি সতর্কতা বিবৃতি প্রণয়ন করে যেখানে উল্লেখ করা হয় যে, নিরাপত্তা বাহিনীর ভাবমূর্তি/সুনাম ক্ষুন্নকারি কর্মকাণ্ড সমূহকে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হবে। অধিকার’এর সম্পাদক আদিলুর রহমান এবং পরিচালক এএসএম নাসিরুদ্দিন এলান এর বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের দায়ে গঠিত ফৌজদারি অভিযোগ অনিষ্পন্ন অবস্থায় রাখা হয়।  

অপর একটি প্রখ্যাত মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক) কে গুম এবং বিচার বহির্ভূত হত্যা বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য চাপের মধ্যে রাখা হয়। ২০১৪ সালের মে মাসে আসক বিবৃতি প্রদান করে যে, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের তদন্ত বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ নুর খান-কে অপহরণের চেষ্টা চালিয়েছে। আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু ইস্যু সমূহ নিয়ে কর্মরত সংগঠন সমূহ তাদের উপর ভীতিমূলক নজরদারির কথা বারংবার উল্লেখ করে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে নিয়ে কর্মরত সংগঠন সমূহ চলমান বিধিনিষেধের সম্মুখীন হয়।

বাক-স্বাধীনতা

বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সমালোচনাকারী সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরকার সমর্থকরা মামলা দায়ের করেন। আগস্ট মাসে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মুহাম্মদ রুহুল আমিন খন্দকার প্রাণনাশক সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দোষারোপ করে তাঁর দেয়া ২০১১ সালের একটি ফেসবুক মন্তব্যের জন্য অভিযুক্ত হন। আগস্ট মাসের শেষের দিকে, সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে একটি ফেসবুক মন্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁকে অভিযুক্ত করা হয় যে, উক্ত মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি একজন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ নেতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন আত্মীয় ও তাঁর মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের ‘ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছেন’।

বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল (নিচে দেখুন) বিষয়ে সমালোচনাকারী সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের কর্মীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ করা হয় এবং বিচারের সম্মুখীন করা হয়। সাংবাদিক  ডেভিড বার্গম্যানকে ট্রাইব্যুনালের সমালোচনার জন্য আদালত অবমাননার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এই দণ্ডাদেশের বিপক্ষে সুশীল সমাজের ৪৯ জন প্রতিনিধি একটি আবেদনে সাক্ষর করলে তাদের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার অভিযোগ দায়ের করা হয়। দন্ডাদেশ এড়াতে তাঁদের বেশীরভাগই নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।  

২০১৫ সালে, ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপক্ষে লেখার জন্য বেশ কয়েকজন ব্লগার এবং তাদের প্রকাশককে ইসলামি জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করেন। আল-কায়েদার সাথে সম্পৃক্ত আনসার-আল-ইসলাম নামক একটি জঙ্গি সংগঠন এর দায় স্বীকার করে এবং আরও আক্রমণের হুমকি দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসকল আক্রমণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও, তিনি ব্লগারদেরকেও “জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” না করার ব্যাপারে সতর্ক করে দেন। অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসে তিন জন বিদেশী ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা ঘটে, পরবর্তীতে যার দায় সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (যা ISIS নামেও পরিচিত) স্বীকার করে নেয়। আপাতদৃষ্টিতে এই সকল ঘটনা ধর্মের নামে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে।

শ্রম অধিকার

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে রানাপ্লাজা ফ্যাক্টরি ভবন ধ্বসের পর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ শুরু হলে তৈরি পোশাক শিল্পে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং শ্রম অধিকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড সমূহ বাংলাদেশে তাদের ব্যবহৃত সকল কারখানার অগ্নি এবং নিরাপত্তা পরিদর্শন পরিচালনা করার এবং এর প্রতিবেদন জনগণের নিকট প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত তদন্ত সমূহের প্রতিবেদন অপ্রকাশিত থাকার কারণে এ সম্পর্কে উদ্বেগ থেকেই যায়। ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ এবং কারখানার ব্যবস্থাপক এবং মালিক কর্তৃক ইউনিয়নের যোগদানে ইচ্ছুক ব্যক্তিগন হুমকি এবং বিরোধিতার সম্মুখীন হন; কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা শারীরিক সহিংসতারও শিকার হন।    

অন্যান্য শিল্পে শ্রম পরিস্থিতি বেশ মন্দ ছিল। ঢাকাস্থ আবাসিক এলাকা হাজারীবাগে অবস্থিত চামড়া শিল্প কারখানা (ট্যানারি) সমূহের বিরুদ্ধে শ্রম আইন এবং পরিবেশ আইন প্রয়োগ না করার কার্যত নীতি সরকার অব্যাহত রেখেছে। ট্যানারির শ্রমিকরা উচ্চমাত্রার বিষাক্ত এবং বিপদজনক কর্ম পরিবেশের জন্য ভোগান্তির শিকার হয়ে থাকেন এবং স্থানীয় অধিবাসীরা ট্যানারির কার্যক্রমে বায়ু, পানি ও মাটি দূষণের ফলে সৃষ্ট অসুখ-বিসুখের বিষয়ে অভিযোগ করেন। কিছু কিছু ট্যানারি সাভারের শিল্প এলাকার নির্ধারিত স্থানে নতুন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করলেও সেখানে উৎপাদন এখনও শুরু হয়নি এবং এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত সেখানে ট্যানারি সমূহের উন্নত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি অস্পষ্ট ছিল।   

বাল্য বিবাহ এবং জোরপূর্বক বিবাহ

১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিবাহের হার বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি। বাংলাদেশের ৬৫% মেয়েদের ১৮ বছরের নিচে বিয়ে দেয়া হয়। আইনত বিবাহযোগ্য বয়স ১৮ হলেও এই আইনের প্রয়োগ প্রায় নেই  বললেই চলে। ঘুষের বিনিময়ে নকল জন্ম-নিবন্ধন সনদ প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা বাল্য বিবাহে সহযোগিতা করেন।   

২০১৫ সালে এই চর্চা বন্ধের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার ব্যর্থ হয়। বাল্য বিবাহ রোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ সমূহ গ্রহণ করা জরুরী, যেমন, বিনামূল্যে শিক্ষাদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বিদ্যালয়ের আনুসঙ্গিক খরচ সমূহ হ্রাস করণ; বাল্য বিবাহ রোধে বিদ্যালয় সমূহের দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা  পালন; বাল্য বিবাহে সহযোগিতাকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ; বাল্য বিবাহ, যৌন হয়রানি এবং নারীর প্রতি হুমকি রোধে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা জোরদার করণ; নারীদের নিকট পরিবার পরিকল্পনা এবং জন্মনিয়ন্ত্রন বিষয়ক তথ্যের অভিগমন নিশ্চিতকরণ; এবং বাল্য বিবাহের স্বাস্থ্যগত ও আইনগত ফলাফল সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করণ।  

২০১৪ সালে, শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিবাহ, এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিবাহ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার সরকার মেয়েদের বিবাহের বয়স ১৬ তে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছিল।

প্রবাসী শ্রমিক

অনেক বাংলাদেশী পারস্য উপসাগরের দেশ সমূহে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই সরকার এ ধরণের শ্রমিক নিয়োগের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে চেয়েছে। উপসাগরীয় দেশসমূহে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকরা জানিয়েছেন যে তাদেরকে খাবার দেয়া হয় না এবং তাদের উপর জোরপূর্বক মানিসিক, শারীরিক, ও যৌন নির্যাতন করা হয়।  বাংলাদেশ সর্বনিম্ন বেতন ২০০ ইউএস ডলার নির্ধারণ করেছে, যা প্রেরণকারী দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে কম। উক্ত অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস সমূহ সেখানকার অনেক বাংলাদেশী নাগরিকদেরকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা এবং সহযোগিতা প্রদান করে না। 

শরণার্থী

বার্মা-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ইউএনএইচসিআর পরিচালিত ক্যাম্প সমূহে প্রায় ৩২,০০০  রোহিঙ্গা শরণার্থী দীর্ঘকাল ধরে বাস করেন। এ সকল শরণার্থী এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী আরও ২০০,০০০ রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা প্রায়শই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সীমান্ত এলাকায় সহায়তা প্রদানে আগ্রহী মানবিক সংস্থা সমূহকে কড়া বিধি নিষেধের সম্মুখীন হতে হয়।

যুদ্ধাপরাধের বিচার

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গুরুতর পদ্ধতিগত এবং বাস্তবিক ত্রুটিসমূহ প্রশমনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ২০১৫ সালে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে, যার ফলস্বরূপ ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়।

এপ্রিল মাসে জামায়াতে ইসলামির শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড ফাঁসির মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। তার বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায্য বিচারের কিছু মৌলিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করা হয়। আসামি পক্ষের সাক্ষী এবং দলিল সহ অন্যান্য সাক্ষ্য পেশ করার ক্ষমতা সীমিত করা এবং সাক্ষীদের পূর্বের অসমাঞ্জস্য বক্তব্যের বিষয়ে জেরা করার ক্ষমতাও সীমিত করা হয়।

জুলাই মাসে, বিএনপি সদস্য মীর কাসেম আলি, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রদত্ত মৃত্যু দন্ডাদেশ আপিল পর্যায়ে বলবত রাখা হয়। রাষ্ট্রপতি তাদের শেষ মুহূর্তের প্রাণ-ভিক্ষার আবেদন নামঞ্জুর করলে, ২১ নভেম্বরে তার (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরি) এবং আলি আহমেদ মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই প্রতিবেদন লেখার সময় আরও বেশ কয়েকজন অভিযুক্ত তাদের চূড়ান্ত আপীলের রায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এর মধ্যে মতিউর রহমান নিজামি একজন, যাকে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। 

যৌন প্রবৃত্তি এবং লিঙ্গগত পরিচয়

সমকামী যৌন আচরণ, মতান্তরে “প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সঙ্গম” বাংলাদেশে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামিক নেতাদের সমকামিতা বিরোধী মন্তব্যের প্রেক্ষিতে সমকামী নারী, সমকামী পুরুষ, উভ-কামী এবং হিজড়াদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন সমূহ ক্রমাগত হুমকির সম্মুখীন হয়।  

২০১৩ সালে মন্ত্রীপরিষদ একটি পরিপত্র জারী করে যেখানে ‘হিজড়া’ নামক একটি তৃতীয় লিঙ্গের আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়,যা কিনা প্রথাগত ও সাংস্কৃতিক ভাবে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি বিশেষের অপর নাম যারা জন্মলগ্নে পুরুষ হিসেবে সনাক্ত হলেও পরবর্তীতে নিজেদের পুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করে না। তৃতীয় লিঙ্গের কোন দাপ্তরিক সংজ্ঞা না থাকলেও আপাতদৃষ্টিতে এই পরিপত্র হিজড়াদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আবাসন অধিকার বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। তবে, এই পরিপত্রে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি প্রাপ্তির কোন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত করা হয় নি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ১২ জন হিজড়াকে সরকারী কর্মসংস্থান পরিকল্পনার জন্য নির্বাচিত করা হয় এবং ২০১৫ সালে উক্ত নিয়োগের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাদেরকে আগ্রাসনমূলক এবং নির্যাতনমূলক পরীক্ষার শিকার হতে হয়। হিজড়গণ বলেন যে, তাদেরকে তাদের শরীর সম্পর্কে অবমাননাকর প্রশ্ন করা হয়। কয়েকজন জানান যে, পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাদেরকে “জঘন্য” বলে সম্বোধন/অবহিত করেন এবং তারপর হাসপাতালের দারোয়ান এবং নিরাপত্তা রক্ষীদেরকে শারীরিক পরীক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেন। এর অংশ হিসেবে, তাদের যৌনাঙ্গ সমূহ স্পর্শ করা হয়। মেডিক্যাল পরীক্ষার কিছু পরেই, উক্ত হিজড়ার নাম পত্রিকার প্রবন্ধে প্রকাশ করা হয়, যেখানে তাদেরকে ভণ্ড বলে আখ্যায়িত করা হয়, কারণ তারা নাকি “আসলে পুরুষ”। এই ১২ জনকে কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করা হয়, এবং পরবর্তীতে তাদেরকে নিজ প্রতিবেশী কর্তৃক নিগৃহীত হতে হয় বলে জানা গেছে।     

গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পক্ষবৃন্দ 

জুন মাসে, বাংলাদেশ ও ভারত একটি সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে যার মাধ্যমে দুটি দেশের মধ্যে ক্ষুদ্র ভূখণ্ড ছিটমহল সমূহ আদান-প্রদান করা হয়। এই চুক্তির আগে ছিটমহলের বাসিন্দারা কার্যত রাষ্ট্রহীন ভাবে বসবাস করছিলেন। অনেকের নিজ সম্পত্তির ওপর আইনগত অধিকারও ছিলনা।  

রাজনৈতিক বিপক্ষ ও সুশীল সমাজের উপর নিপীড়ন বন্ধ করতে সরকারকে চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এবং ভারতের মত প্রভাবশালী দ্বিপাক্ষিক অংশীদার রাষ্ট্র সমূহ। অন্যান্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি এসকল রাষ্ট্র চরমপন্থি গোষ্ঠী সমূহকে দমন করার জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানালেও জঙ্গিবাদের সাথে রাজনৈতিক বিপক্ষ দলের সম্পৃক্ততা বিষয়ে সরকারের দাবির স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ চাইতে পারেনি বা সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেনি। মূলত, বিরোধী দলের ওপর কৃত নির্যাতনের স্বপক্ষে সরকার এই যুক্তি দাঁড় করিয়েছিল।  

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস র‍্যাবের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কর্মসূচির জন্য আর্থিক ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা প্রদান করে। কিন্তু এই কর্মসূচীর ফলে নতুন কোন মানবাধিকার সংক্রান্ত মামলা বা দন্ডাদেশ সৃষ্টি হয় নি এবং যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাবের জবাবদিহিতার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসমক্ষে খুব বেশি কিছু বলে নি।

২০১২ সালে ভারত অবৈধ ভাবে সীমান্ত পারাপাররত বাংলাদেশী অভিবাসীদের ওপর গুরুতর নির্যাতনের জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ২০১৫ সালে এর অগ্রগতি হয়েছে খুব সামান্য।   

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে রানাপ্লাজা ফ্যাক্টরি ভবন ধ্বসের পর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ শুরু হলে, দুইটি আন্তর্জাতিক কো-অপারেটিভ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যেখানে বাংলাদেশে তাদের ব্যবহৃত সকল কারখানায় অগ্নি এবং নিরাপত্তা তদন্ত পরিচালনা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি করা হয়। এর একটি হল ইয়োরোপীয় কোম্পানি সমূহের সাথে (বাংলাদেশ অ্যাকর্ড) এবং অপরটি বৃহত্তর উত্তর আমেরিকান কোম্পানি গুলোর সাথে (জোট)। অ্যাকর্ড শ্রম আইন সংস্কারের জন্য চাপ প্রয়োগ করলে সরকার অ্যাকর্ডের কর্মপরিসর শুধুমাত্র নিরাপত্তা তদন্তের মধ্যে সীমিত করে দেয়। শ্রমখাতে সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদের পর্যাপ্ত উন্নতি না করতে পারার যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি প্লাস মর্যাদা প্রত্যাহার করে।

বাংলাদেশ

২০১৫ সালে বাংলাদেশ একটি স্বেচ্ছাচারিতা পূর্ণ গতিপথে পরিচালিত হতে থাকে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচন বয়কট করার পর থেকে বাংলাদেশের কোনও সক্রিয় সংসদীয় বিরোধীদল ছিল না। সংসদীয় বিতর্কের বদলে, ২০১৫ সালে বিএনপিকে রাজপথে নামতে দেখা যায় এবং আওয়ামীলীগ নেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে অবতীর্ণ হতে দেখা যায় বাক স্বাধীনতা হরণ এবং সুশীল সমাজকে ছত্রভঙ্গ করার ভূমিকায়।

বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে, রাজপথের বিক্ষোভ সহিংস রূপ ধারণ করলে রাজপথে সাধারণ যাত্রীদের অনেকেই আহত হন ও প্রাণ হারান। ঘন ঘন অবরোধ ও হরতালের কারণে শিশুদের স্কুলে যাওয়া এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়।

রাজপথের সহিংসতা দমনের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, বিরোধী দলের হাজার হাজার সদস্যদের বন্দী এবং বিরোধীদলের পরিকল্পিত বিক্ষোভের পূর্বে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে নজরবন্দী করে রাখার মাধ্যমে সরকার এর জবাব দেয় । বিরোধী দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদেরকে বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে কিছু অভিযোগ ছিলো সাজানো। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অনেকেই গা ঢাকা দেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক হত্যা, গুম এবং নির্বিচারে আটকের মত বেশ কয়েকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়; যার মধ্যে মাত্র কয়েকটিতে দোষীদের তদন্ত বা বিচারের আওতায় আনা হয়।     

বাক-স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সরকারের সমালোচনাকারী গণমাধ্যম সমূহকে বন্ধ করে দেয়া হয়, এবং এদের সম্পাদকদের বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। নাস্তিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল চারজন ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। উক্ত আক্রমণ সমূহের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার বদলে, সরকার বাক-স্বাধীনতা চর্চায় নিয়ন্ত্রণ আনতে ব্লগারদের প্রতি আহ্বান জানায়। সরকারের সমালোচনা করার দায়ে সুশীল সমাজের কর্মী এবং সাংবাদিকগণ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার শিকার হন এবং অন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনার জন্য আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হন।

২০১৩ সালের রানাপ্লাজা ভবন ধ্বসে হাজারেরও বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু এবং আহত হওয়ার ঘটনার পর, পোশাক কারখানার নিরাপত্তা বিধানে বাংলাদেশ বেশ অগ্রগতি সাধন করে। ২০১৫ সালে শ্রম আইনে কিছু উন্নয়নমূলক সংশোধন আনা হয়, যেখানে ইউনিয়ন গঠন বিষয়ক স্বেচ্ছাচারী আইনি জটিলতা দূর করা হয়। তবে, ইউনিয়ন গঠনকে বাধাগ্রস্ত করতে কিছু কিছু কারখানার মালিকরা হুমকি এবং সহিংসতা প্রয়োগ করেন।

নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন এবং বিচারহীনতা

মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আপোষহীন ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামীলীগ সরকার দায়িত্বগ্রহণ করলেও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে এবং কোন কোন স্থানে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিচার বহির্ভূত আটক, নির্যাতন, গুম এবং হত্যা সহ বেশ কিছু মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটনের জন্য দায়ী ছিল পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)  এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‍্যাব)।

২০১৫ সালের ১০ মার্চ বিরোধীদল বিএনপি'র মুখপাত্র সালাউদ্দিন আহমেদ তাঁর একজন বন্ধুর বাসভবনে আত্মগোপনকালে অপহৃত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অপহরণকারীরা নিজেদেরকে গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে উক্ত এলাকায় র‍্যাব এর গাড়ি উপস্থিত ছিল। মে মাসে সালাউদ্দিন আহমেদকে ভারতে খুঁজে পাওয়া যায় এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এর নিকট এই মর্মে আশ্রয় প্রার্থনা করেন যে, তিনি কয়েকজন অজ্ঞাত বন্দুকধারী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন এবং তিনি আশঙ্কা করছেন যে বাংলাদেশে ফিরে গেলে তাঁর  জীবনহানী ঘটবে। এই ঘটনায় এবং অন্যান্য গুমের ঘটনায় সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে তদন্ত পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি যেসকল ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা দুষ্কৃতিকারীদেরকে র‍্যাব অথবা পুলিশ বাহিনীর সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেসকল ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করা হয় নি।

বিরোধীদল জামায়াত-ই-ইসলামি দাবি করে যে, পুলিশ এবং গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা তাদের কর্মীদের উপর গ্রেপ্তার ও নির্যাতন চালিয়েছে।  তারা আরও জানায় যে, তাদের বেশ কিছু সদস্য নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নিহত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ৩১ জানুয়ারি প্রত্যক্ষদর্শীরা আহমাদুল্লাহ নামক দলের একজন ২২ বছর বয়সী ছাত্র সমর্থককে পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হতে দেখেন; পরদিন সকালে তার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ দাবি করে তিনি নিরাপত্তা বাহিনী এবং জামায়াত সমর্থকদের মধ্যেকার ক্রসফায়ারে নিহত হন।  

বেশ কয়েকজন জামায়াত সমর্থক বলেন যে, পুলিশ তাদেরকে হেফাজতে নিয়ে যায় এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে বিকলাঙ্গ করার উদ্দেশ্যে তাদের হাঁটু এবং জঙ্ঘাস্থিতে গুলি করে। ‘অধিকার’ নামক বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংস্থা অন্তত পক্ষে এরূপ ৩০টি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে যেখানে গ্রেপ্তারের কিছু সময় পরে গ্রেপ্তারকৃতদের পায়ে গুলি করা হয়। পুলিশ দাবি করে যে,  সহিংস জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার প্রচেষ্টায় গুলি বর্ষণের ঘটনা সমূহ ঘটে।    

আইন ও সালিশ কেন্দ্র নামক বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০১৫ এর মধ্যবর্তী সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নিহত ১৩৫ জনের মধ্যে ৯০ জন পুলিশ কর্তৃক, ৩৩ জন র‍্যাব কর্তৃক এবং বাকিরা বিজিবি সহ অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য কর্তৃক নিহত হন।

আগস্ট মাসে র‍্যাবকে ক্ষমতাসীন দলের তিনজন সদস্যকে হত্যার জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যা সরকার সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

সুশীল সমাজের ওপর আক্রমণ

২০১৫ সালে সরকার নাগরিক সংগঠন ও সরকারের সমালোচকদের উপর আরো অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশী সংস্থা সমূহের বৈদেশিক তহবিলের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে একটি নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার” কে প্রতিনিয়ত হয়রানীর শিকার হতে হয় এবং এর বৈদেশিক তহবিল প্রাপ্তি আটকে দেয়া হয়। আগস্ট মাসে “অধিকার” বিচার বহির্ভূত হত্যার বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যার প্রেক্ষিতে পুলিশ একটি সতর্কতা বিবৃতি প্রণয়ন করে যেখানে উল্লেখ করা হয় যে, নিরাপত্তা বাহিনীর ভাবমূর্তি/সুনাম ক্ষুন্নকারি কর্মকাণ্ড সমূহকে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হবে। অধিকার’এর সম্পাদক আদিলুর রহমান এবং পরিচালক এএসএম নাসিরুদ্দিন এলান এর বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের দায়ে গঠিত ফৌজদারি অভিযোগ অনিষ্পন্ন অবস্থায় রাখা হয়।  

অপর একটি প্রখ্যাত মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক) কে গুম এবং বিচার বহির্ভূত হত্যা বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য চাপের মধ্যে রাখা হয়। ২০১৪ সালের মে মাসে আসক বিবৃতি প্রদান করে যে, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের তদন্ত বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ নুর খান-কে অপহরণের চেষ্টা চালিয়েছে। আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু ইস্যু সমূহ নিয়ে কর্মরত সংগঠন সমূহ তাদের উপর ভীতিমূলক নজরদারির কথা বারংবার উল্লেখ করে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে নিয়ে কর্মরত সংগঠন সমূহ চলমান বিধিনিষেধের সম্মুখীন হয়।

বাক-স্বাধীনতা

বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সমালোচনাকারী সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরকার সমর্থকরা মামলা দায়ের করেন। আগস্ট মাসে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মুহাম্মদ রুহুল আমিন খন্দকার প্রাণনাশক সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দোষারোপ করে তাঁর দেয়া ২০১১ সালের একটি ফেসবুক মন্তব্যের জন্য অভিযুক্ত হন। আগস্ট মাসের শেষের দিকে, সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে একটি ফেসবুক মন্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁকে অভিযুক্ত করা হয় যে, উক্ত মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি একজন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ নেতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন আত্মীয় ও তাঁর মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের ‘ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছেন’।

বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল (নিচে দেখুন) বিষয়ে সমালোচনাকারী সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের কর্মীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ করা হয় এবং বিচারের সম্মুখীন করা হয়। সাংবাদিক  ডেভিড বার্গম্যানকে ট্রাইব্যুনালের সমালোচনার জন্য আদালত অবমাননার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এই দণ্ডাদেশের বিপক্ষে সুশীল সমাজের ৪৯ জন প্রতিনিধি একটি আবেদনে সাক্ষর করলে তাদের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার অভিযোগ দায়ের করা হয়। দন্ডাদেশ এড়াতে তাঁদের বেশীরভাগই নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।  

২০১৫ সালে, ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপক্ষে লেখার জন্য বেশ কয়েকজন ব্লগার এবং তাদের প্রকাশককে ইসলামি জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করেন। আল-কায়েদার সাথে সম্পৃক্ত আনসার-আল-ইসলাম নামক একটি জঙ্গি সংগঠন এর দায় স্বীকার করে এবং আরও আক্রমণের হুমকি দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসকল আক্রমণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও, তিনি ব্লগারদেরকেও “জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” না করার ব্যাপারে সতর্ক করে দেন। অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসে তিন জন বিদেশী ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা ঘটে, পরবর্তীতে যার দায় সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (যা ISIS নামেও পরিচিত) স্বীকার করে নেয়। আপাতদৃষ্টিতে এই সকল ঘটনা ধর্মের নামে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে।

শ্রম অধিকার

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে রানাপ্লাজা ফ্যাক্টরি ভবন ধ্বসের পর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ শুরু হলে তৈরি পোশাক শিল্পে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং শ্রম অধিকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড সমূহ বাংলাদেশে তাদের ব্যবহৃত সকল কারখানার অগ্নি এবং নিরাপত্তা পরিদর্শন পরিচালনা করার এবং এর প্রতিবেদন জনগণের নিকট প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত তদন্ত সমূহের প্রতিবেদন অপ্রকাশিত থাকার কারণে এ সম্পর্কে উদ্বেগ থেকেই যায়। ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ এবং কারখানার ব্যবস্থাপক এবং মালিক কর্তৃক ইউনিয়নের যোগদানে ইচ্ছুক ব্যক্তিগন হুমকি এবং বিরোধিতার সম্মুখীন হন; কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা শারীরিক সহিংসতারও শিকার হন।    

অন্যান্য শিল্পে শ্রম পরিস্থিতি বেশ মন্দ ছিল। ঢাকাস্থ আবাসিক এলাকা হাজারীবাগে অবস্থিত চামড়া শিল্প কারখানা (ট্যানারি) সমূহের বিরুদ্ধে শ্রম আইন এবং পরিবেশ আইন প্রয়োগ না করার কার্যত নীতি সরকার অব্যাহত রেখেছে। ট্যানারির শ্রমিকরা উচ্চমাত্রার বিষাক্ত এবং বিপদজনক কর্ম পরিবেশের জন্য ভোগান্তির শিকার হয়ে থাকেন এবং স্থানীয় অধিবাসীরা ট্যানারির কার্যক্রমে বায়ু, পানি ও মাটি দূষণের ফলে সৃষ্ট অসুখ-বিসুখের বিষয়ে অভিযোগ করেন। কিছু কিছু ট্যানারি সাভারের শিল্প এলাকার নির্ধারিত স্থানে নতুন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করলেও সেখানে উৎপাদন এখনও শুরু হয়নি এবং এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত সেখানে ট্যানারি সমূহের উন্নত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি অস্পষ্ট ছিল।   

বাল্য বিবাহ এবং জোরপূর্বক বিবাহ

১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিবাহের হার বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি। বাংলাদেশের ৬৫% মেয়েদের ১৮ বছরের নিচে বিয়ে দেয়া হয়। আইনত বিবাহযোগ্য বয়স ১৮ হলেও এই আইনের প্রয়োগ প্রায় নেই  বললেই চলে। ঘুষের বিনিময়ে নকল জন্ম-নিবন্ধন সনদ প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা বাল্য বিবাহে সহযোগিতা করেন।   

২০১৫ সালে এই চর্চা বন্ধের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার ব্যর্থ হয়। বাল্য বিবাহ রোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ সমূহ গ্রহণ করা জরুরী, যেমন, বিনামূল্যে শিক্ষাদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বিদ্যালয়ের আনুসঙ্গিক খরচ সমূহ হ্রাস করণ; বাল্য বিবাহ রোধে বিদ্যালয় সমূহের দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা  পালন; বাল্য বিবাহে সহযোগিতাকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ; বাল্য বিবাহ, যৌন হয়রানি এবং নারীর প্রতি হুমকি রোধে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা জোরদার করণ; নারীদের নিকট পরিবার পরিকল্পনা এবং জন্মনিয়ন্ত্রন বিষয়ক তথ্যের অভিগমন নিশ্চিতকরণ; এবং বাল্য বিবাহের স্বাস্থ্যগত ও আইনগত ফলাফল সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করণ।  

২০১৪ সালে, শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিবাহ, এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিবাহ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার সরকার মেয়েদের বিবাহের বয়স ১৬ তে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছিল।

প্রবাসী শ্রমিক

অনেক বাংলাদেশী পারস্য উপসাগরের দেশ সমূহে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই সরকার এ ধরণের শ্রমিক নিয়োগের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে চেয়েছে। উপসাগরীয় দেশসমূহে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকরা জানিয়েছেন যে তাদেরকে খাবার দেয়া হয় না এবং তাদের উপর জোরপূর্বক মানিসিক, শারীরিক, ও যৌন নির্যাতন করা হয়।  বাংলাদেশ সর্বনিম্ন বেতন ২০০ ইউএস ডলার নির্ধারণ করেছে, যা প্রেরণকারী দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে কম। উক্ত অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস সমূহ সেখানকার অনেক বাংলাদেশী নাগরিকদেরকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা এবং সহযোগিতা প্রদান করে না। 

শরণার্থী

বার্মা-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ইউএনএইচসিআর পরিচালিত ক্যাম্প সমূহে প্রায় ৩২,০০০  রোহিঙ্গা শরণার্থী দীর্ঘকাল ধরে বাস করেন। এ সকল শরণার্থী এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী আরও ২০০,০০০ রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা প্রায়শই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সীমান্ত এলাকায় সহায়তা প্রদানে আগ্রহী মানবিক সংস্থা সমূহকে কড়া বিধি নিষেধের সম্মুখীন হতে হয়।

যুদ্ধাপরাধের বিচার

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গুরুতর পদ্ধতিগত এবং বাস্তবিক ত্রুটিসমূহ প্রশমনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ২০১৫ সালে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে, যার ফলস্বরূপ ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়।

এপ্রিল মাসে জামায়াতে ইসলামির শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড ফাঁসির মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। তার বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায্য বিচারের কিছু মৌলিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করা হয়। আসামি পক্ষের সাক্ষী এবং দলিল সহ অন্যান্য সাক্ষ্য পেশ করার ক্ষমতা সীমিত করা এবং সাক্ষীদের পূর্বের অসমাঞ্জস্য বক্তব্যের বিষয়ে জেরা করার ক্ষমতাও সীমিত করা হয়।

জুলাই মাসে, বিএনপি সদস্য মীর কাসেম আলি, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রদত্ত মৃত্যু দন্ডাদেশ আপিল পর্যায়ে বলবত রাখা হয়। রাষ্ট্রপতি তাদের শেষ মুহূর্তের প্রাণ-ভিক্ষার আবেদন নামঞ্জুর করলে, ২১ নভেম্বরে তার (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরি) এবং আলি আহমেদ মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই প্রতিবেদন লেখার সময় আরও বেশ কয়েকজন অভিযুক্ত তাদের চূড়ান্ত আপীলের রায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এর মধ্যে মতিউর রহমান নিজামি একজন, যাকে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। 

যৌন প্রবৃত্তি এবং লিঙ্গগত পরিচয়

সমকামী যৌন আচরণ, মতান্তরে “প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সঙ্গম” বাংলাদেশে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামিক নেতাদের সমকামিতা বিরোধী মন্তব্যের প্রেক্ষিতে সমকামী নারী, সমকামী পুরুষ, উভ-কামী এবং হিজড়াদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন সমূহ ক্রমাগত হুমকির সম্মুখীন হয়।  

২০১৩ সালে মন্ত্রীপরিষদ একটি পরিপত্র জারী করে যেখানে ‘হিজড়া’ নামক একটি তৃতীয় লিঙ্গের আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়,যা কিনা প্রথাগত ও সাংস্কৃতিক ভাবে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি বিশেষের অপর নাম যারা জন্মলগ্নে পুরুষ হিসেবে সনাক্ত হলেও পরবর্তীতে নিজেদের পুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করে না। তৃতীয় লিঙ্গের কোন দাপ্তরিক সংজ্ঞা না থাকলেও আপাতদৃষ্টিতে এই পরিপত্র হিজড়াদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আবাসন অধিকার বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। তবে, এই পরিপত্রে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি প্রাপ্তির কোন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত করা হয় নি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ১২ জন হিজড়াকে সরকারী কর্মসংস্থান পরিকল্পনার জন্য নির্বাচিত করা হয় এবং ২০১৫ সালে উক্ত নিয়োগের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাদেরকে আগ্রাসনমূলক এবং নির্যাতনমূলক পরীক্ষার শিকার হতে হয়। হিজড়গণ বলেন যে, তাদেরকে তাদের শরীর সম্পর্কে অবমাননাকর প্রশ্ন করা হয়। কয়েকজন জানান যে, পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাদেরকে “জঘন্য” বলে সম্বোধন/অবহিত করেন এবং তারপর হাসপাতালের দারোয়ান এবং নিরাপত্তা রক্ষীদেরকে শারীরিক পরীক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেন। এর অংশ হিসেবে, তাদের যৌনাঙ্গ সমূহ স্পর্শ করা হয়। মেডিক্যাল পরীক্ষার কিছু পরেই, উক্ত হিজড়ার নাম পত্রিকার প্রবন্ধে প্রকাশ করা হয়, যেখানে তাদেরকে ভণ্ড বলে আখ্যায়িত করা হয়, কারণ তারা নাকি “আসলে পুরুষ”। এই ১২ জনকে কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করা হয়, এবং পরবর্তীতে তাদেরকে নিজ প্রতিবেশী কর্তৃক নিগৃহীত হতে হয় বলে জানা গেছে।     

গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পক্ষবৃন্দ 

জুন মাসে, বাংলাদেশ ও ভারত একটি সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে যার মাধ্যমে দুটি দেশের মধ্যে ক্ষুদ্র ভূখণ্ড ছিটমহল সমূহ আদান-প্রদান করা হয়। এই চুক্তির আগে ছিটমহলের বাসিন্দারা কার্যত রাষ্ট্রহীন ভাবে বসবাস করছিলেন। অনেকের নিজ সম্পত্তির ওপর আইনগত অধিকারও ছিলনা।  

রাজনৈতিক বিপক্ষ ও সুশীল সমাজের উপর নিপীড়ন বন্ধ করতে সরকারকে চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এবং ভারতের মত প্রভাবশালী দ্বিপাক্ষিক অংশীদার রাষ্ট্র সমূহ। অন্যান্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি এসকল রাষ্ট্র চরমপন্থি গোষ্ঠী সমূহকে দমন করার জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানালেও জঙ্গিবাদের সাথে রাজনৈতিক বিপক্ষ দলের সম্পৃক্ততা বিষয়ে সরকারের দাবির স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ চাইতে পারেনি বা সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেনি। মূলত, বিরোধী দলের ওপর কৃত নির্যাতনের স্বপক্ষে সরকার এই যুক্তি দাঁড় করিয়েছিল।  

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস র‍্যাবের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কর্মসূচির জন্য আর্থিক ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা প্রদান করে। কিন্তু এই কর্মসূচীর ফলে নতুন কোন মানবাধিকার সংক্রান্ত মামলা বা দন্ডাদেশ সৃষ্টি হয় নি এবং যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাবের জবাবদিহিতার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসমক্ষে খুব বেশি কিছু বলে নি।

২০১২ সালে ভারত অবৈধ ভাবে সীমান্ত পারাপাররত বাংলাদেশী অভিবাসীদের ওপর গুরুতর নির্যাতনের জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ২০১৫ সালে এর অগ্রগতি হয়েছে খুব সামান্য।   

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে রানাপ্লাজা ফ্যাক্টরি ভবন ধ্বসের পর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ শুরু হলে, দুইটি আন্তর্জাতিক কো-অপারেটিভ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যেখানে বাংলাদেশে তাদের ব্যবহৃত সকল কারখানায় অগ্নি এবং নিরাপত্তা তদন্ত পরিচালনা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি করা হয়। এর একটি হল ইয়োরোপীয় কোম্পানি সমূহের সাথে (বাংলাদেশ অ্যাকর্ড) এবং অপরটি বৃহত্তর উত্তর আমেরিকান কোম্পানি গুলোর সাথে (জোট)। অ্যাকর্ড শ্রম আইন সংস্কারের জন্য চাপ প্রয়োগ করলে সরকার অ্যাকর্ডের কর্মপরিসর শুধুমাত্র নিরাপত্তা তদন্তের মধ্যে সীমিত করে দেয়। শ্রমখাতে সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদের পর্যাপ্ত উন্নতি না করতে পারার যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি প্লাস মর্যাদা প্রত্যাহার করে।