Police rush Bangladesh Nationalist Party (BNP) supporters at a protest on February 9, 2018, Dhaka, Bangladesh.

© 2018 Allison Joyce/Getty Images

(নিউ ইয়র্ক) – ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ এর নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আজ এ কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের উচিত নিরপেক্ষভাবে সহিংসতার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের অভিযুক্ত করা।

‘“আতঙ্ক সৃষ্টি’; বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধীদল ও সমালোচকদের উপর হামলা”, শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী-সর্বোপরি কর্তৃত্ব সেইসাথে ব্যাপক নজরদারী ও বাক স্বাধীনতার উপর আক্রমণ একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যখনই বিরোধীদলীয় সমর্থকদের উপর সহিংস হামলা করা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ আচরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। পুলিশ বিরোধীদলীয় সদস্যদের গ্রেফতার ও আটক করেছে, কিন্তু বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের লক্ষ্য করে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের হামলার বিরুদ্ধে সঠিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই প্রতিবেদন ডিসেম্বরের আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত ফলাফলকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেছেন “নির্বাচনের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধির মত আচরণ করা উচিত নয়," । "প্রচারণা চলাকালীন বিরোধীদলকে লক্ষ্য  করে সহিংসতা, তাদের অন্যায় আচরণ তুলে ধরে।"

রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের সঙ্গে ৫০ টিরও বেশি সাক্ষাতকার, আদালতের রেকর্ড, তথ্যের বিশ্লেষণ, প্রতিবাদকারী এবং বিরোধীদলীয় ব্যক্তিদের আটকে রাখার নথিপত্র, ক্ষমতাসীন দলের যুবনেতাদের দ্বারা সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শনের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা  হয়েছে। বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশন সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলি নিবন্ধন, প্রার্থী মনোনয়ন এবং ফলাফল সহ নির্বাচনী প্রচারণা ভিত্তিক সহিংসতা সমাধান করার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত নয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের উচিত তাদের অনুসারীদের সহিংস নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া।

হিউম্যান রাইট ওয়াচ জানিয়েছে যে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  মতবিরোধীতা ও সমালোচনাকে দমন করার চেষ্টা করেছে। সাংবাদিকরা বলেন যে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) অনুসন্ধানীমূলক সাংবাদিকতা নিষিদ্ধ করে। বাংলাদেশিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিশীলিত মতামত প্রকাশ অথবা গ্রেফতারের ঝুঁকির কারনে চাপের মুখে আছেন। একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেন, "আমরা ভয়ের পরিবেশে বসবাস করি।”

প্রার্থী তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হওয়া ও প্রচারণা শুরু হওয়ার সাথে সাথে নির্বাচনী সহিংসতা শুরু হয়। ১১ ই ডিসেম্বর পৃথক দুটি ঘটনায় আওয়ামী লীগের দুই সদস্য নিহত হন এবং ১৬ ই ডিসেম্বর একটি পার্টি অফিস ভাংচুর করা হয়। তবে বেশিরভাগ সহিংসতা বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিএনপি) ও বিরোধী দলীয় জোট জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট কে লক্ষ্য করে করা হয়। যদিও পুলিশ ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে অভিযোগ দায়ের ও দোষীদের গ্রেফতার করে, কিন্তু বিরোধীদলের অভিযোগ উপেক্ষা করে।

প্রধান দলগুলোর প্রত্যেকেরই সহিংসতার জন্য অন্যকে দায়ী করে। কিন্তু যদি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা বিরোধীদের সমর্থক হন, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশন সাধারণত পদক্ষেপ নিতে অস্বীকার করে, এমনকি এই ঘটনাটি স্বীকার করতে অস্বীকার করে।

বিএনপির প্রার্থী মোঃ আসাদুজ্জামান হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেন, ১১ ই ডিসেম্বরে ঝিনাইদহে তার নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা হওয়ার পর তিনি বারবার কমিশনের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, "তারা অভিযোগ গ্রহণ করে, কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেয় না”।

১৬ই ডিসেম্বর তারিখে আবদুল মঈন খানসহ ১২ ই ডিসেম্বর আফরোজা খানম রিতা এবং ১১ ই ডিসেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িতে এক ধারাবাহিক হামলার সংবাদ প্রচার করে মিডিয়া। ১৫ ই ডিসেম্বরে পুলিশ ও তার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় অন্য বিএনপি প্রার্থী রমনা মাহমুদ আহত হন।

১৪ই ডিসেম্বরে ক্ষমতাসীন দলের অভিযুক্ত সদস্যরা ওআইসি ফ্রন্টের নেতা কামাল হোসেনকে বহনকারী গাড়িতে হামলা চালায়। যদিও তিনি আহত হননি, তবে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন।

ডেইলি স্টারের মতে, ১৭ই ডিসেম্বরে কমপক্ষে ২৬ জন বিরোধী প্রার্থীর মোটরসাইকেল বহরে আক্রমণ করা হয়েছে, ১৩ জন  বিরোধীদলীয় প্রার্থী আহত হয়েছেন, দুইজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, এবং ৮৭৫ জন বিরোধীদলীয় সমর্থক আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে কিছুর অবস্থা আশংকাজনক। একই সময়ে দুই আওয়ামী লীগ সদস্য ও ৭৫ জন আহত হয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছেন, "নির্বাচনে কেন্দ্রীভূত সহিংসতার মূল লক্ষ্য আওয়ামী লীগের লোকেরা।"

এই সহিংসতার মধ্যে, সরকার ১৪ ই ডিসেম্বরের মধ্যে ১৫০ জনেরও বেশি বিরোধীদলীয় সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে। বিএনপি'র মতে নির্বাচনের মাসে, "মিথ্যা ও সাজানো" মামলায় ৩০ হাজারেরও বেশি নেতা ও কর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং হাজার হাজারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে, ১৮ ই  নভেম্বর দেশব্যাপী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলি হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছে, নির্বিচারে গ্রেফতার ও আটকে রাখার বিরুদ্ধে সেইসাথে মত প্রকাশ এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার সহ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার (আইসিসিপিআর) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলি মেনে চলার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে যে তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠাবে এবং হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভ নির্বাচনের "নিরপেক্ষতা ও অংশগ্রহণ" নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের এবং বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মোতায়েন করছে, যুক্তরাজ্য স্থানীয় পর্যবেক্ষক নিয়োগ করছে, এবং কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষনের অনুরোধ বিবেচনা করছে।

অ্যাডামসের মতে নির্বাচনের আগে এবং পরে সহিংসতার ঝুঁকি কমানোর জন্য সকল দলকে জোর দেওয়া উচিত যে তাদের সমর্থকরা সহিংসতা থেকে বিরত থাকবেন এবং কর্তৃপক্ষের উচিত নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করা, বাংলাদেশের স্থায়ীত্ব ও গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত আন্তর্জাতিক নেতারা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির জন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রকাশ্যে চাপ প্রয়োগ করতে থাকবেন।"