60 বছরের আনুয়ারা বেগম, তাঁর জামাইয়ের কথা মনে করে কাঁদেন, যে একজন কৃষক ছিল, আর্সেনিকজনিত অসুস্থতায় যার মৃত্যু ঘটেছে। তাঁর নিজেরও আর্সেনিক-জনিত শারীরিক সমস্যা আছে, কিন্তু কখনও চিকিৎসককে দেখান নি। 5ই মার্চ 2016, বাংলাদেশ, কুমিল্যা জেলায়, লাকসাম উপজেলার আইরুআইন গ্রাম।

 

(ঢাকা, এপ্রিল 6, 2016)-বাংলাদেশের সরকার গ্রামীন অঞ্চলের বিস্তির্ণ এলাকাজুড়ে বিশুদ্ধ পানিতে প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত সাড়া প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। আজ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। আন্তর্জাতিক মহলের প্রাথমিক নজরে আসার প্রায় বছর বিশেক পরেও বাংলাদেশের অন্তত 20 মিলিয়ন মানুষ, যারা প্রধানত গ্রামাঞ্চলে বসবাস করছেন, এখনও দূষিত পানি পান করছেন, যার দূষণের মাত্রা জাতীয় মাপকাঠির অনেক উপরে।

“স্বজনপ্রীতি ও অবহেলা” শীর্ষক 111 পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে আর্সেনিকের সংস্পর্শে আসায় মানবস্বাস্থ্যে যে বিরূপ প্রভাব পরে তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কীভাবে অবজ্ঞা করে যাচ্ছে তাই ফুটে উঠেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, আর্সেনিক দূষণজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় 43,000 লোক মারা যায়। প্রাথমিকভাবে, সরকার মানুষের ত্বকের ক্ষত থেকে আর্সেনিক দূষণজনিত রোগ শনাক্ত করছে, যদিও তাদের অধিকাংশই পরিপূর্ণতা পায় না। আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই রয়েছেন ক্যান্সার, হৃদরোগ ও ফুসফুসের রোগের ঝুঁকিতে। কিন্তু অনেকেই কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সেবা পান না।

“গ্রামীণ অঞ্চলের লাখ লাখ লোকের খাবার পানি থেকে আর্সেনিক দূর করার জন্য সরকার মৌলিক, স্পষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না”, বলেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও এই প্রতিবেদন প্রণেতা রিচার্ড পারহাউস। “সরকার এমনভাবে কাজ করছে তাতে মনে হচ্ছে সমস্যা প্রায় সমাধান হয়ে গেছে, কিন্তু সরকার ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে প্রতিরোধযোগ্য এই আর্সেনিক দূষণজনিত রোগে লাখ লাখ বাংলাদেশি মারা যাবে”।

প্রতিবেদনের জন্য হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আর্সেনিক জনিত রোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে এমন মানুষ, পাঁচটি গ্রামে সরকারিভাবে নিয়োগকৃত নলকুপের তত্ত্বাবধায়ক, সরকারি কর্মকর্তা ও এনজিও কর্মকর্তাসহ 134 জন লোকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে। এছাড়াও সংস্থাটি 2006 থেকে 2012 সালের মধ্যবর্তী সময়ে স্থাপিত প্রায় 125,000টি সরকারি সুপেয় পানির পয়েন্ট (সরকারের অধিকাংশ পানির পয়েন্ট এই সময়েই স্থাপিত হয়েছিল) সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে অধিকাংশ অগভীর হস্ত-পাম্প চালিত নলকুপের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গিয়েছে। যদিও গভীর নলকুপ ভাল মানের পানিস্তরে পৌঁছাতে সক্ষম, কিন্তু যেসব অঞ্চলে অর্সেনিক দূষণের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে সেসব এলাকায় গভীর নলকুপ স্থাপনে সরকারি কর্মসূচিতে কোনো প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায় না।

তারওপর, কিছু জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতিবিদ এসব নলকুপ যাদের খুবই দরকার তাদেরকে না দিয়ে, নিজ এলাকার রাজনৈতিক সমর্থক ও জোটের লোকদের জন্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

“যদি সংসদ সদস্য [নতুন বরাদ্দের] 50 শতাংশ এবং উপজেলা [সাব-ডিস্ট্রিক্ট] চেয়ারম্যান 50 শতাংশ পায়, তাহলে প্রকৃতার্থে যাদের নলকুপ দরকার তাদের জন্য কিছুই থাকে না,” হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সঙ্গে আলাপকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক কর্মকর্তা এসব কথা বলেন।

এছাড়াও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আর্সেনিক দূষন প্রশমিত করার ক্ষেত্রে সঠিক পরিবীক্ষণ ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখতে পেয়েছে। সংখ্যায় খুবই কম কিন্ত উল্রেখযোগ্য ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সরকার কর্তৃক সম্প্রতি স্থাপিত নলকুপসমুহেও জাতীয় মানদণ্ডের (সহনীয় মাত্রার) ওপরে আর্সেনিক দূষণ পাওয়া গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্তৃক সরকারের উপাত্ত বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে, পুনপরীক্ষিত নলকুপের অন্তত 5 শতাংশ নলকুপে বাংলাদেশের সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক দূষণ রয়েছে।

এই (বিশ্বব্যাংক এর উচিত ত্বরিতগতিতে ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এর পানি পরীক্ষা করা, যদি কোনোটি দূষিত পাওয়া যায়, তাহলে তা প্রতিস্থাপন অথবা পুনর্বাসিত করা। উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটি 2004 থেকে 2010 সাল পর্যন্ত প্রায় 13,000 নলকুপ স্থাপনের জন্য অর্থায়ন করেছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে, এবং তাদের আরো বেশি কাজ করা দরকার, তবে তা অধিকতর তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে, বলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

1995 সালে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিক দূর্ষণের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। 1999 থেকে 2006 সাল পর্যন্ত, সরকার, আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী এবং এনজিওগুলো বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ প্রশমণ করার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা করেছে।

জাতীয় নলকুপ পরীক্ষা কর্মসূচির অধীনে (যার অধিকাংশ হয়েছিল 2000 থেকে 2003 সালের মধ্যে) দেশের অন্তত 5 মিলিয়ন নলকুপ ফিল্ড কিটের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয়, এবং দূষণের জাতীয় মানদণ্ডের উপরে (লাল) বা নিচে(সবুজ) এর উপর ভিত্তি করে নলকুপগুলোকে লাল অথবা সবুজ রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। এই পরীক্ষানুসারে জানা যায়, প্রায় 20 মিলিয়ন লোক প্রতি লিটারে 50 মাইক্রোগ্রাম এর বেশি (জাতীয় মানদন্ড)আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে।

তবে 2006 সাল থেকে এ ধরনের প্রচেষ্টা গ্রহণের গুরুত্বে ভাটা পড়েছে। 2013 সালে পানযোগ্য পানির মান বিষয়ক এক জাতীয় গবেষণায় আগের পরীক্ষার মতো একই ফলাফল পাওয়া যায়, এতেও দেখা যায় প্রায় 20 মিলিয়ন লোক সহনীয় মাত্রার উপরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান ও ব্যবহার করছে।

“এসব জীবনরক্ষাকারী জাতীয় সম্পদ যাতে জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতিবিদরা নিজেদের সমর্থক ও জোটের জন্য ব্যবহার করতে না পারে সে ব্যাপারে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে,” বললেন পারহাউস। “নিরাপদ পানি সরবরাহে সরকারের অঙ্গীকারের প্রতি জনগণের এখনো যেটুকু আস্থা রয়েছে তা শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই দূষিত সরকারি নলকুপগুলো অতিদ্রুত প্রতিস্থাপন বা পুনবার্সিত করতে হবে”।

 

সাক্ষাৎকার দেয়া লোকদের বিবৃতি:

“আর্সেনিকজনিত সমস্যা উত্থিত হলেই তারা বলে, ‘আপনাদের অসুস্থতার বিষয়ে আমাদের কিছুই করার
নেই’।” নৌকা, বালিয়া গ্রামের একজন নারী যার কাঁধ, বাহু হাতের তালুর পিছনে কালো দাগ রয়েছে।

 “আমি কখনোই হাসপাতালে যাইনি, কোনো ডাক্তারও দেখাইনি। আমি কোনো ওষুধও খাই না। সরকারের কোনো লোক এখনও পর্যন্ত আমাকে আর্সেনিক সম্পর্কে কিছু জানায়নি অথবা আমি যে আর্সেনিক দূষণজনিত রোগে ভুগছি সে সম্পর্কেও কিছু বলেনি”। – আস্থা, রূপপুর গ্রামের নামে 40 বছর বয়সি একজন নারী যার আর্সেনিক দূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

“এই এলাকায় কোনো সরকার স্থাপিত নলকুপ নেই। দেখুন আমার সন্তানদের অবস্থা! এমনকি আমরা যদি আমাদের সাধ্যমতো ভাল খাবারও তাদেরকে খাওয়াই এবং তাদের যত্ন নেই, তারপরও তারা আর্সেনিকযুক্ত পানির কারণে অসুস্থ হয়ে পড়বে”। – খবর, বিলমামুদপুর গ্রামের 30 এর কোঠায় একজন কৃষক যার বুক পায়ে আর্সেনিক সংক্রান্ত ক্ষত রয়েছে।

“সরকারি লোকজন এসে নলকুপ পরীক্ষা করা এবং কুপের গায়ে লাল অথবা সবুজ রঙ দিয়ে চিহ্নিত করার [নলকুপটি জাতীয় মানদণ্ডের উপরে বা নিচে রয়েছে তা নির্দেশিত করার জন্য] পর 10 বছর হয়ে গেছে। আমি চাই তারা আবার আসুক এবং সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করুক”। অগ্রহায়ণ, রূপপুর গ্রামের মধ্য 50 এর একজন পুরুষ যার আর্সেনিক দূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

 “এই গ্রামে সরকার স্থাপিত কোনো নলকুপ নেই। পাশের স্কুলে তারা একটি নলকুপ স্থাপন করেছে, কিন্তু কয়েক বছর যাবৎ সেটি কাজ করছে না। তারা আমাদেরকে কোনো নলকুপ দিচ্ছে না, কিন্তু কেন তা আমরা জানি না। আর আমি এটাও জানি না, এর জন্য কার কাছে চাইতে হবে, কিভাবে চাইতে হবে”। জানালা, রূপপুর গ্রামের 40 বছর বয়সী একজন নারী যার আর্সেনিক দূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

“অনেক সরকারি নলকুপ মানুষের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে; বাড়ির মালিকরা সরকারি লোকদেরকে ঘুষ দেয় অথবা তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগায়। এমন কি আমরা জানিওনা যে, এই নলকুপগুলো কোথায় কোথায় আছে, এতটাই গোপনীয় রাখা হয়েছে। এ নিয়ে ভাবতে গেলেই আমার রাগ উঠে যায়”। খাদ্র, রূপপুর গ্রামের 30 বছর বয়সী কৃষক যার আর্সেনিক দূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

“রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে নতুন নলকুপের স্থান নির্বাচন করা হয়। এগুলো তারা তাদের রাজনৈতিক সমর্থক ও জোট, তাদের ঘনিষ্টজনদের অথবা যারা তাদের জন্য কাজ করে তাদেরকে দেয়। এটা খুবই হতাশাজনক, তারা জনগণের প্রকৃত প্রয়োজনের কথা কখনোই বিবেচনা করেন না”। – নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক
সরকারি কর্মকর্তা

“আমার পরিবারের ছয়জন লোক এই নলকুপ থেকে পানি পান করে। আমরা অন্যদেরকে এখান থেকে পানি পান করতে দেই না। আমার শ্বশুর উপজেলা [সাব-ডিস্ট্রিক্ট] চেয়ারম্যানের বন্ধু। তারা উভয়ে একই রাজনৈতিক দলে কাজ করেন, তাই তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বন্ধুত্বও রয়েছে। আমরা উপজেলা চেয়ারম্যানকে 30,000 টাকা (প্রায় 390 মার্কিন ডলার) দিয়েছি”। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি নলকুপ তত্ত্বাবধায়ক